অনেকটা নীরবে চলে গেল নবাব খাজা সলিমুল্লাহর জন্মবার্ষিকী
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
অনেকটা নীরবে নিভৃতে চলে গেল নবাব খাজা সলিমুল্লাহর জন্মবার্ষিকী। খাজা সলিমুল্লাহ বা নবাব সলিমুল্লাহ (৭ জুন ১৮৭১-১৬ জানুয়ারি ১৯১৫) ঢাকার চতুর্থ নবাব ছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন খাজা আহসান উল্লাহ্ এবং পিতামহ ছিলেন খাজা আবদুল গণি। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে তিনি জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম নেতা এবং ঢাকার নবাব পরিবারে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। বাংলার মুসলমানদের শিক্ষা, রাজনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
নবাব সলিমুল্লাহ্ মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯০৬ সালে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুসলিম নেতাদের সম্মেলনে তাঁর উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার আদায় এবং পাকিস্তান আন্দোলনে এই সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মুসলমানদের সামান্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রতি তিনি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা প্রশাসন, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল এবং বঙ্গভঙ্গ তাদের উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে। মুসলমানদের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের মুসলমান নেতৃত্ব, এটিকে নিজেদের শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখেছিল। এ কারণেই তাঁর মতো মুসলিম নেতৃবৃন্দ বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিলেন।
অবিভক্ত বাংলায় কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পূর্ববঙ্গ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল। মুসলমানদের শিক্ষার হারও কম ছিল। বঙ্গভঙ্গের ফলে নতুন প্রদেশ “পূর্ববঙ্গ ও আসাম” গঠণ এবং ঢাকাকে প্রশাসনিক কেন্দ্র ঘোষণা করায় পূর্ববঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও শিক্ষার প্রসারের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
বঙ্গভঙ্গের ফলে প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল। অবিভক্ত বাংলার প্রশাসনে মুসলমানদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। নতুন প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় সরকারি চাকরি ও প্রশাসনে তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল।
বঙ্গভঙ্গের ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। পূর্ববঙ্গ ছিল প্রধানত কৃষিনির্ভর অঞ্চল। পাটসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন হলেও প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক সুবিধার বেশিরভাগই কেন্দ্রীভূত ছিল কলকাতায়। বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকাকে কেন্দ্র করে অবকাঠামো, যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের আশা দেখা দিয়েছিল।
এছাড়া নতুন প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এতে মুসলিম নেতৃত্বের বিকাশ এবং মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হয়। ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানী হওয়ায় এর প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
মুসলিম সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গভঙ্গ পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন হিন্দু মানসিকতা বঙ্গভঙ্গকের কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি, ভারতবর্ষব্যাপী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সৃষ্টি হয় এবং ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, বঙ্গভঙ্গকে শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক বা শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত ছিল।
শিক্ষার বিস্তারে ঢাকার নবাবদের অবদান: ঢাকার নবাব পরিবার কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বই দেয়নি, বরং শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষত আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (বর্তমান বুয়েট) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে তাদের অবদান বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। নবাব সলিমুল্লাহ্ মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় উৎসাহিত করেন এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করেন। তাঁর প্রচেষ্টা পরবর্তীকালে ঢাকায় উচ্চশিক্ষা বিস্তারের ভিত্তি তৈরি করে।
কাজা আহসানউল্লাহর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে তাঁর পরিবার ১৯০৮ সালে ঢাকায় আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠানটি Bangladesh University of Engineering and Technology যা বর্তমানে বুয়েটে রূপান্তরিত হয়েছিল, যা বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি সৃষ্টিতেও নবাবদের ভূমিকা অবিষ্মরণীয়। বঙ্গভঙ্গ রদের পর নবাব সলিমুল্লাহ্ ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে নেমে পড়েন। যদিও ১৯১৫ সালে তিনি ইন্তেকাল করলেও ১৯২১ সালে তাদের জমি ও বসতবাড়ীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
মানবিক ও সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমেও তাঁর সময়ে খাজা সলিমুল্লাহ্ ছিলেন অদ্বিতীয় ও অনুকরণীয়। তিনি দরিদ্র জনগণের সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন জনহিতকর কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করেন। দুর্যোগকালেও তিনি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
নবাব খাজা সলিমুল্লাহ্ একদিকে মুসলিম শিক্ষা ও রাজনৈতিক জাগরণের পথিকৃৎ হিসেবে প্রশংসিত, অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গ সমর্থনের কারণে কিছু ইতিহাসবিদের সমালোচনারও মুখোমুখি। তবে বাংলার মুসলমানদের শিক্ষা ও রাজনৈতিক উন্নয়নে তাঁর অবদান ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি ছিলেন উদার, দূরদর্শী এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ নেতা। মুসলমানদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক চেতনা ও আত্মবিশ্বাসের জন্ম হয়।