অভিযোগের পাহাড় নিয়ে চুপ্পু পদত্যাগ করলেও বিচার নিয়ে সংশয়
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই। তার পদত্যাগে রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বস্তি ফিরলেও তাকে ঘিরে নানা আলোচনা ডালপালা বাড়ছেই। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বগণমাধ্যমে উঠে এসেছে তার দুর্নীতি এবং অপরাধে জড়ানোর বহু খবর। তার বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংকের ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তার পদত্যাগে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুদকের কমিশনার ছিলেন। ওই সময়ে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এছাড়া তার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা হযেছিল। জানা যায়, দুদকের চাকরিতে থাকার সময় থেকেই তিনি সাবেক যোগযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাকোতে পার্ট টাইম চাকরি নিয়েছিলেন তিনি।
জানা যায়, দুদকের চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের সাথে সে সময় বিরোধে তৈরি জড়ান কমিশনার সাহাবুদ্দিন। সে সময় থেকে দুদকে তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে কমিশনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। ১/১১ এর জরুরি সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে একাধিক মামলা ছিল দুদকে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে কমিশনের কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন এসব মামলার তদন্তে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। বিশেষ করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মিগ-২০ বিমান কেনার দুর্নীতির মামলা থেকে তাকে দায়মুক্তি দেওয়া হয় তারই সুপারিশে পাশাপাশি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। সে মামলায় পরে খালেদা জিয়াকে দণ্ডিত ঘোষণা করা হয়। এবং খালেদা জিয়াকে কারাবরণ করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মো. সাহাবুদ্দিন দুদকের কমিশনার থাকাকালে দুর্নীতি দমন কমিশনে একচ্ছত্র প্রভাব ছিল তার। তার কারণে আওয়ামী লীগের তৎকালীন এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের কোনো অভিযোগ স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করতে পারত না কমিশন। কমিশনের বৈঠকে তিনি প্রায় বিভিন্ন অনুসন্ধান বা মামলায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতেন। এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অনুসন্ধান বা মামলার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতেন। দুদকে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের পক্ষ নিয়ে কাজ করারও অভিযোগ ওঠে। এমনকি মোটা অঙ্কের ঘুস নেওয়ারও অজস্র অভিযোগ ছিল গণমাধ্যমের অনুসন্ধ্যানে। সেসব অভিযোগ আর নানা বিতর্কের মধ্যেই দেশবাসীকে অবাক করে দিয়ে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির সময়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুম-খুন এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেন। ওই কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় মো. সাহাবুদ্দিনকে। তিনি ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন তৈরিতে বড় ভূমিকা পালন করেন।
তার দেওয়া ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার কারণ ও সুপারিশ প্রণয়নের জন্য প্রতিবেদন সরকার গেজেট আকারে প্রকাশ করে। তিনি মুজিব হত্যা মামলায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিযুক্ত সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে মো. সাহাবুদ্দিন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসহ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডেস্ক অফিসার হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে দুদকে ৫ বছর কমিশনার হিসেবে কাজ করেছেন। তার সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন নিজেই দুর্নীতির প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মোটা অঙ্কের ঘুসের বিনিময়ে অনেক দুর্নীতিবাজের রক্ষাকবচ হয়ে কাজ করতেন সাহাবুদ্দিন। দুর্নীতি বন্ধে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান। কিন্তু তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতেন না সাহাবুদ্দিন। তার এমন কর্মকাণ্ডের কারণেই গোলাম রহমান প্রকাশ্য এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে দুদককে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ বলে আখ্যা দেন। গোলাম রহমানের এমন বক্তব্যে ক্ষিপ্ত হন সাহাবুদ্দিন। কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার বিরোধও তৈরি হয়। পরে ২০১৬ সালে মো. সাহাবুদ্দিনের দুদক থেকে বিদায় নেন।
এছাড়া, দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। হাইকোর্টে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে জেএমসি বিল্ডার্সের মাধ্যমে ব্যাংকের শেয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং এস আলম গ্রুপের স্বার্থ রক্ষায় তার ভূমিকার অভিযোগ উঠে এসেছে।
২০১৭ সালে সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে এস আলম গ্রুপ ব্যাংক কোম্পানি আইনের একাধিক বিধান লঙ্ঘন করে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ওই সময় জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে তিনি ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন এবং প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হাইকোর্টের নির্দেশে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারির বিষয়ে তদন্ত শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা (বিএফআইইউ)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে জমা দেওয়া ৪২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ব্যাংকের শেয়ার জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নানা তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেএমসি বিল্ডার্স ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ বের করে সেই অর্থ দিয়েই পুনরায় ব্যাংকের শেয়ার কিনেছে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদে থেকে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে আর্থিক সংকটে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং বর্তমানে হাইকোর্টে এসংক্রান্ত মামলার শুনানি চলছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো দুর্নীতির মামলার রায় না থাকলেও, তার কার্যকাল ও অতীত দায়িত্ব পালন নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম ও দুবাইতে পার্মানেন্ট বাড়ি-গাড়ি ও বিভিন্ন ব্যবসার রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের। দুদক কমিশনার থাকাকালীন ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির তদন্তের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সাহাবুদ্দিন দুদক কমিশনা থাকা সময়ে দুদকে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্র। বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা এবং কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে ঘুসের ষড়যন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তাদের হাতে আছে। তখন সরকারের প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্ট না হয়ে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলারের ঋণ বাতিল করে।
পরে পদ্মা সেতুসংশ্লিষ্ট অসদাচরণের কারণে এসএনসি-লাভালিন ও এর শতাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। ওই সময় সাহাবুদ্দিন ছিলেন দুদকের কমিশনার (তদন্ত) এবং সংস্থাটির সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখগুলোরও একজন। ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। কিন্তু তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে আসামি করা হয়নি। তখন এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিশ্বব্যাংকের নিয়োগ করা লুইস মোরেনো ওকাম্পোর নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল বলেছিল, আবুল হোসেনকে এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করার মতো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ ও উপাদান ছিল।
এসএনসি-লাভালিনের নথি, সম্ভাব্য ঘুসের হিসাব এবং পরামর্শক নিয়োগে মন্ত্রীর ভূমিকা তুলে ধরে প্যানেল দুদকের ব্যাখ্যার সমালোচনা করেছিল। তাদের ভাষ্য ছিল, আবুল হোসেনকে বাদ দেওয়ার কিছু যুক্তি প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোথাও বাংলাদেশের আইনের বিকৃত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। দুদক তারপরও আবুল হোসেনকে বাদ দিয়েছিল।
মো. সাহাবুদ্দিন দুদকের তদন্ত বিভাগের কমিশনার হিসেবে তখন বলেছিলেন, দেশের আইন ও বিদেশের আইনের ব্যাখ্যা এক নয়। তিনি একপর্যায়ে দাবি করেন, মামলা দায়েরে বিশ্বব্যাংকের প্যানেল সন্তুষ্ট।
ওই সময়ের দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান পরে বলেছেন, প্যানেল সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি- কোনোটিই তাকে জানায়নি। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও সাহাবুদ্দিনকে আলোচনায় নিয়ে আসে।
২০১৪ সালের ‘ক্লিনচিট’, ২০২৫ সালের আলামত: পদ্মা সেতু-সংক্রান্ত সেই মামলার প্রায় ২০ মাস তদন্তের পর ২০১৪ সালে দুদক জানায়, দুর্নীতি বা ঘুসের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আদালতেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে দেয় দুদক। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই সেই মামলার সাত আসামির সবাই অব্যাহতি পান। কমিশনার হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনও সেই সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমর্থক ছিলেন। পরে কানাডার আদালতেও এসএনসি-লাভালিনের তিন সাবেক কর্মকর্তা খালাস পান। আওয়ামী লীগ ও সরকার এটিকে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণের দলিল হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়াটি ছিল কিছুটা ভিন্ন। আদালত গুরুত্বপূর্ণ ওয়্যারট্যাপ প্রমাণ গ্রহণযোগ্য নয় বলে বাদ দেন।
এরপর প্রসিকিউশন আর সাক্ষী বা প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। ফলে ফৌজদারি অভিযোগ আদালতে টেকেনি। সুতরাং কানাডার রায়কে বাংলাদেশের তদন্তে ওঠা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বলা কঠিন। বিশ্বব্যাংকের প্রশাসনিক অনুসন্ধানের মানদণ্ডও ফৌজদারি আদালতের মানদণ্ডের মতো ছিল না
বিতর্কটি নতুন করে ফিরে আসে ২০২৫ সালে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালে দুদক মামলাটি পুনঃতদন্ত শুরু করে। তখন দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেন, পরামর্শক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে। তার অভিযোগ ছিল, আগের কমিশন পর্যাপ্ত উপাদান থাকার পরও মামলাটি ‘জোর করে’ নিষ্পত্তি করেছিল। মূল্যায়ন কমিটি পরিবর্তন, একই উপকরণ বা সেবা একাধিকবার কেনা দেখানো এবং জীবনবৃত্তান্ত মূল্যায়নে অসঙ্গতিসহ কয়েকটি দিক সামনে আনা হয়। সেখান থেকে পুরোনো প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়।
২০২৫ সালে যে আলামত পাওয়া গেল, ২০১৪ সালে তা কেন দেখা হয়নি? বিশ্বব্যাংকের প্যানেলের আপত্তি কেন গুরুত্ব পায়নি? আবুল হোসেনকে কেন এজাহারের বাইরে রাখা হয়েছিল? সাহাবুদ্দিন একা মামলা করেননি। একা বন্ধও করেননি। সিদ্ধান্ত ছিল কমিশনের। কিন্তু তদন্ত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার এবং সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য রক্ষক হিসেবে দায়ের প্রশ্ন থেকে তিনি বের হতে পারেননি। মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অভিযোগটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক। সেটা হচ্ছে দুদকের নিরপেক্ষতা নষ্ট করা। অনুসন্ধানের পরিধি সীমিত রাখা। ক্ষমতাসীনদের বিষয়ে নমনীয় থাকা। বিরোধীদের বিষয়ে রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করা।
২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রার্থীর সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার তথ্য হলফনামায় প্রকাশিত হয়। তখন সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলে নির্বাচন ব্যাহত হতে পারে। পরে সমালোচনার মুখে দুদক সেই অবস্থান থেকে সরে আসে।
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশকে (টিআইবি) নিয়ে সাহাবুদ্দিনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তখন অনেক সমালোচক বলেছেন, তার ভাষা দুদক কমিশনারের চেয়ে রাজনৈতিক নেতার মতো শোনায়। পাবনায় শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়ে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনের অর্থায়নেও মো. সাহাবুদ্দিনের নাম এসেছিল। সাহাবুদ্দিন অবশ্য পরে দাবি করেছিলেন, তার অনুমতি ছাড়াই নামটি ব্যবহার করা হয়েছে। তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান এম বদিউজ্জামান ও দুদক কমিশনার থাকাকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অর্থ কেলেঙ্কারির তদন্তটি ধামাচাপা দিয়েছিলেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে স্বৈরাচারের আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইনকিলাব মঞ্চ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল। আইনী পদক্ষেপ নেয়ার ব্যর্থত ও সরকারের নির্লিপ্ততায় চুপ্পুর রাজনৈতিক দোসর ফ্যাসিস্ট অপশক্তি সংগঠিত হয়ে দেশ ও রাষ্ট্রের হুমকী হিসাবে আবির্ভূত হতে পারে।
*কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা