আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনা থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান: আকাঙ্ক্ষার বিস্তৃত রাজনৈতিক পাঠ
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই অভ্যুত্থানকে শুধু একটি নির্দিষ্ট দাবি বা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ব্যাপ্তি ও অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষাকে বোঝা কঠিন। এর শিকড় খুঁজতে গেলে ২০২১ সালের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আন্দোলন, তার পরবর্তী রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, ভোটাধিকারসহ জন অধিকার হরণ, রাজনৈতিক বৈষম্য, জবাবদিহিতার সংকট ও আধিপত্যবিরোধী জনমনের অসন্তোষের দিকে তাকাতে হয়।
তবে এটিও সত্য যে, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সরলরৈখিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দুটি আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, অংশগ্রহণকারী জনগোষ্ঠী, দাবির প্রকৃতি ও রাজনৈতিক পরিণতি ছিল ভিন্ন। কিন্তু উভয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন ছিল—রাষ্ট্রের ওপর জনগণের অধিকতর সার্বভৌমত্ব, জাতীয় মর্যাদা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বহিরাগত প্রভাবের বিরোধিতা এবং স্বাধীনভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আকাঙ্ক্ষা।
২০২১: আধিপত্যবিরোধী চেতনার নতুন রাজনৈতিক প্রকাশ
২০২১ সালের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক প্রতিবাদ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রতিবাদকারীদের একটি অংশ মোদির ভারতীয় রাজনীতি, বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এই আন্দোলনের রাজনৈতিক আবহকে আরও তীব্র করে।
এই আন্দোলনে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠেছিল—বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আধিপত্যবাদ’ শব্দটি নতুন করে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর অর্থ কেবল কোনো একটি দেশের প্রভাব নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্পর্কব্যবস্থা, যেখানে একটি রাষ্ট্র মনে করে তার পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, অর্থনীতি বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অন্য রাষ্ট্রের অতিরিক্ত প্রভাব রয়েছে। এই চেতনা পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক অর্থ লাভ করে। একদিকে ভারতীয় আধিপত্যের অভিযোগ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা—দুইয়ের সমন্বয়ে ‘স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার’ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়।
২০২৪: আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে যে ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার প্রাথমিক দাবি ছিল মূলতঃ সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির মধ্য দিয়ে আন্দোলনের চরিত্র ক্রমশ বদলে যায়। একটি নির্দিষ্ট নীতিগত দাবি ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আন্দোলনের বিস্তার ঘটে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে। একপর্যায়ে এটি পরিণত হয় সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে, যার কেন্দ্রে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের সংকট, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থাহীনতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের বিরুদ্ধে জনরোষ।
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের এই পর্যায়ে আধিপত্যবিরোধী চেতনাও আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপাদান হয়ে ওঠে। অনেকের কাছে এটি ছিল জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন; আবার কারও কাছে এর অর্থ ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জনগণের ইচ্ছা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। জুলাইয়ের গণআন্দোলনের বিস্তৃত আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক রাজনৈতিক উপাদান হিসেবে আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনাকে চিহ্নিত করা যায়।
‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ আকাঙ্ক্ষার বিস্তার
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর বহুমাত্রিকতা। শুরুতে এটি ছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন; পরে তা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পরিণত হয়। শিশু, নারী, শ্রমিক, পেশাজীবী, সাধারণ নাগরিক—বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।
এই বিস্তৃত অংশগ্রহণের পেছনে কাজ করেছিল বহু বছরের জমে থাকা অসন্তোষ। কেউ রাজনৈতিক অধিকার হারানোর প্রতিবাদে, কেউ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচনের বিরুদ্ধে, কেউ রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের কারণে, কেউ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে, আবার কেউ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অধিকতর জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের প্রত্যাশায় রাজপথে নেমেছিলেন।
ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে একটি মাত্র রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ করা যায় না। ‘ফ্যাসিবাদ নির্মূল’, ‘স্বৈরাচারের অবসান’ কিংবা ‘আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ’—এসব ছিল সেই বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার বিভিন্ন প্রকাশ। মূল আকাঙ্ক্ষাটি ছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ করা।
অর্থাৎ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা—
• যেখানে জনগণের ভোটের অধিকার কার্যকর থাকবে;
• রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হবে;
• আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে;
• মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে;
• বিরোধী মতকে রাষ্ট্রীয় শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে না;
• প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে; এবং
• জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো বিদেশি অপশক্তির অযাচিত প্রভাব গ্রহণযোগ্য হবে না।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আধিপত্যবিরোধী চেতনা ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, কিন্তু পুরো আন্দোলনের একমাত্র ব্যাখ্যা নয়।
আবু সাঈদ ও মুগ্ধ: আত্মত্যাগের প্রতীক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ইতিহাসে আবু সাঈদ ও মুগ্ধের নাম প্রতীকী মর্যাদা লাভ করেছে। তাঁদের মৃত্যু আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে আবু সাঈদের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে একজন নিরস্ত্র মানুষের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।
মুগ্ধের মৃত্যু এবং তাঁর শেষ মুহূর্তের মানবিক ভূমিকা আন্দোলনের আরেকটি ভিন্ন মাত্রা তুলে ধরে। তাঁরা কেবল দুটি ব্যক্তি নন; তাঁদের আত্মত্যাগ একটি প্রজন্মের কাছে অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক হয়ে ওঠে।
তবে এই আত্মত্যাগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। কারণ তাঁদের স্মৃতি কোনো একক দল, মত বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। বরং তাঁদের আত্মত্যাগের তাৎপর্য নিহিত রয়েছে জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও স্বাধীনতার বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষায়।
২০২১ থেকে ২০২৪: একটি চেতনার বিবর্তন
২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিসর বিশ্লেষণ করলে একটি চেতনার বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ২০২১ সালে প্রশ্নটি ছিল—বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিদেশি প্রভাব কতটা থাকা উচিত? ২০২৪ সালে প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত হয়ে দাঁড়ায়—রাষ্ট্রের মালিক কে? জনগণ, নাকি কোনো দল, গোষ্ঠী বা ক্ষমতাকেন্দ্র?
এই দুটি প্রশ্ন পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। কারণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়; জনগণের রাজনৈতিক অধিকারও সার্বভৌমত্বের অংশ। জনগণ যদি নিজের ভোট, মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার অর্থও প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই কারণেই আধিপত্যবিরোধী চেতনা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আকাঙ্ক্ষা একপর্যায়ে একই বৃহত্তর রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে ওঠে—‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারণ করবে।’
আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
তবে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একটি গণঅভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। যে জনগণ রাজপথে জীবন দিয়েছে, তাদের আকাঙ্ক্ষা যদি কেবল সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একইভাবে, আধিপত্যবিরোধী স্লোগান যদি কেবল পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হয়, তাহলেও সেই চেতনা পূর্ণতা পায় না। তাই বলা যায়-জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত উত্তরাধিকার নির্ধারিত হবে তার পরবর্তী রাষ্ট্রসংস্কার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে। ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্যবিরোধী চেতনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার জন্ম দিয়েছে। এই ধারার কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব ও নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ব্যাপ্তি তার চেয়েও অনেক বড়।
চব্বিশের জুলাই ছিল শুধু একটি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ নয়; এটি ছিল বহু বছরের জমে থাকা রাজনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অসন্তোষের সম্মিলিত প্রকাশ। ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার, রাজনৈতিক নিপীড়ন, ভোটাধিকার হরণ, দুর্নীতি, বৈষম্য, গুম, খুন, আয়নাঘর, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, নির্বিচারে রাষ্ট্রের অর্থ লুটপাট ও বিদেশে পাচার, ঋণ খেলাপী, আর্থিক অনিয়ম এবং আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ একই রাজপথে এসে মিলিত হয়েছিল। সেই উত্তাল দিনগুলোতে আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ আন্দোলনকে একটি নৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁদের আত্মদান মনে করিয়ে দেয়—কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি জনগণের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকারকে অস্বীকার করে, তাহলে একসময় জনগণই তার পরিবর্তনের দাবি নিয়ে রাজপথে দাঁড়ায়।
২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক পাঠ সম্ভবত এই—আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশ মানে শুধু বিদেশি প্রভাবমুক্ত বাংলাদেশ নয়; বরং এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ, যেখানে ক্ষমতা জবাবদিহিমূলক, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন এবং নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়—সংবিধান ও আইনের নিশ্চয়তা। এই বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষাই জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে ইতিহাসের কাছে অর্থবহ করে তুলতে পারে। আর সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নই হবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। জন আকাঙ্খা ও সরকার যাতে মুখোমুখি না হয় সেই ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা অর্জনই সরকারের প্রাথমিক কাজ।
রাষ্ট্র সংস্কারের নামে অনির্দিষ্টকাল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বজায় রাখাও সমাধান নয়। সংস্কারকে হতে হবে জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ এবং সময়সীমাবদ্ধ। কোন সংস্কার আগে প্রয়োজন, কোনটি সাংবিধানিক, কোনটি আইনগত এবং কোনটি প্রশাসনিক—এসব বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে সুস্পষ্ট ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে সংস্কারের বাস্তবায়ন যেন কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না হয়, তারও প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা প্রয়োজন। স্বাধীন ও কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা, সংসদীয় জবাবদিহিতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব, মানবাধিকার সুরক্ষা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বায়ত্তশাসন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে শক্তিশালী নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
আমরা কি শুধু একটি শাসনের অবসান ঘটিয়েছি, নাকি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারই স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার মতো একচ্ছত্র ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তন হিসেবে স্মরণীয় হবে, নাকি একটি স্থায়ী রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক রূপান্তরের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
সরকারের প্রধান দায়িত্ব কেবল দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করা নয়; বরং যে রাজনৈতিক সংকট থেকে গণঅভ্যুত্থানের জন্ম হয়েছে, তার কাঠামোগত কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করা। কিন্তু সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অনীহা, দীর্ঘসূত্রতা বা কেবল আনুষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা দিলে গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। তবে রাষ্ট্র সংস্কারে অনীহা দেখালে জুলাইয়ের অর্জন সম্পূর্ণ অর্থে বৃথা যেতে পারে—এমন আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। কারণ গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক সাফল্য তখনই স্থায়ী হয়, যখন তার কারণগুলোকে পুনরুৎপাদনকারী কাঠামোগুলো পরিবর্তিত হয়। অন্যথায় একটি সরকারের পতন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে থাকবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রীয় রূপান্তর ঘটবে না।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন কি যথেষ্ট, নাকি যে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো একটি ফ্যাসিবাদী বা কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করে, সেই কাঠামোরও আমূল সংস্কার প্রয়োজন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বলা যায়, কেবল সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জুলাইয়ের গণআকাঙ্ক্ষার পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বরং যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সাংবিধানিক কাঠামো, প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও কর্তৃত্ববাদ বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, সেগুলোর সংস্কারই হওয়া উচিত গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান উত্তরাধিকার।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান একটি সরকারের পতন ঘটাতে পারে; কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সরকার তৈরির অনুকূল রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয় না। যদি একই ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, দলীয়করণ, প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি বহাল থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক শক্তির হাতেও একই ধরনের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা পুনরায় জন্ম নিতে পারে।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই একটি অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে। প্রশাসনিক কাঠামো, জবাবদিহি ও আইনের সমতার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় রাষ্ট্র পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট ছিল। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই স্থবিরতা কাটিয়ে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান একটি সুসংগঠিত ও ইতিবাচক রাষ্ট্র সংস্কারের ভাবনা সামনে নিয়ে এগোচ্ছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে—গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতায় নয়, বরং জনগণের আস্থায় নিহিত। সেই আস্থা অর্জন ও ধরে রাখার মধ্য দিয়েই টেকসই শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি একটি জবাবদিহিমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর সরকার গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করছেন। নিঃসন্দেহে, এই আস্থা ধরে রাখা এবং তা আরও সুদৃঢ় করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মনে রাখতে হবে-জনগণের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি এবং সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগ। আমরা আশা করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। তাঁর হাত ধরে আগামীর বাংলাদেশ হবে আরও স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও সম্ভাবনাময়।
*লেখক: জুলাই অভ্যূত্থানের সক্রিয় কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক