আমার ঢাকা, প্রিয় ঢাকা-গোড়াপত্তনের ইতিহাস

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

ঢাকা—বাংলাদেশের রাজধানী, বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং কোটি মানুষের আবেগের শহর। আজকের ব্যস্ত, জনবহুল ও আধুনিক ঢাকা একদিনে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে চার শতকের দীর্ঘ ইতিহাস, নদী-বন্দরকেন্দ্রিক জনপদ, মুঘল শাসন, ঔপনিবেশিক প্রশাসন, নবাবি ঐতিহ্য এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিকাশের ধারাবাহিকতা।
ঢাকার গোড়াপত্তন
ঢাকার প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। বর্তমান ঢাকা অঞ্চলে মুঘলদের আগেও জনবসতি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছিল। ঢাকা-এর অবস্থান ছিল বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে, যা নদীপথে যোগাযোগ ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মুঘল সাম্রাজ্যের চতুর্থ সম্রাট সম্রাট জাহাঙ্গীরের (শাসনকাল: ১৬০৫–১৬২৭) শাসনামলে সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ঢাকার উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছিল । মুঘল সুবাদার ইসলাম খান চিশতী নদীপথের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলার বিদ্রোহী বারো ভূঁইয়া, বিশেষ করে মুসা খাঁর প্রতিরোধ দমন করে মুঘল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে পূর্ব বাংলার দিকে সরিয়ে আনেন এবং ঢাকাকে সামরিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম অনুসারে ঢাকার নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীরনগর । তবে সাধারণ মানুষের মুখে ‘ঢাকা’ নামটিই প্রচলিত থেকে যায়।
ইসলাম খান ঢাকাকে রাজধানী করার অন্যতম কারণ ছিল এর কৌশলগত অবস্থান। পূর্ব বাংলার নদীপথ নিয়ন্ত্রণ, বারো ভূঁইয়াদের দমন এবং মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের মোকাবিলায় ঢাকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুড়িগঙ্গা ও আশপাশের নদীপথকে কেন্দ্র করে ঢাকা দ্রুত একটি প্রশাসনিক ও সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
মুঘল আমলে ঢাকার বিকাশ
মুঘল আমলে ঢাকা ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়। বিশেষ করে শায়েস্তা খান-এর শাসনামলে ঢাকা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়। তাঁর সময় ঢাকা বাণিজ্য, কারুশিল্প ও নৌযোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মসলিনের জন্য ঢাকার খ্যাতি তখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মধ্যে লালবাগ কেল্লা, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, বিভিন্ন মসজিদ ও প্রাসাদ সেই সময়ের স্মৃতি বহন করে। লালবাগ কেল্লার নির্মাণ শুরু হলেও তা সম্পূর্ণ হয়নি; তবুও এটি আজও পুরান ঢাকার মুঘল ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। এছাড়া মুঘল আমলে বেশ কিছু মাসজিদ নির্মিত হয়-এসব মসজিদে মুঘল স্থাপত্যের পাশাপাশি বাংলার স্থানীয় নির্মাণরীতিরও প্রভাব দেখা যায়। সাত গম্বুজ মসজিদ (মোহাম্মপুর), চকবাজার শাহী মসজিদ (চকবাজার), খাজা শাহবাজ মসজিদ (দোয়েল চত্বর), খান মুহাম্মদ মৃধা মসজিদ (শেখ সাহেব বাজার, লালবাগ)। এসব মসজিদ শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; তৎকালীন নগরসভ্যতা, স্থাপত্যশিল্প, বাণিজ্যিক ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্র কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত হতো।
রাজধানী স্থানান্তর ও ঢাকার পরিবর্তন
মুঘল প্রশাসনের রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হওয়ার পর ঢাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব কিছুটা কমে যায়। তবে শহরটি বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে টিকে থাকে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকা আবার নতুনভাবে বিকশিত হতে শুরু করে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকা পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হলে শহরটির গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। সেই সময়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক নগর অবকাঠামো গড়ে ওঠে। পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের সামান্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বঙ্গভঙ্গ তৎকালীন হিন্দু মানসিকতা মেনে নিতে পারেনি, ১৯১১ খ্রী: বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর সাময়িকভাবে ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা হারায় তবে এর নগরজীবন ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অব্যাহত থাকে।
ঢাকা থেকে বাংলাদেশের রাজধানী
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হয়। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ঢাকা ছিল কেন্দ্রীয় মঞ্চ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে নতুন পরিচয় লাভ করে। এরপর ধীরে ধীরে শহরটি দেশের প্রশাসন, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
আমার ঢাকা, প্রিয় ঢাকা
ঢাকার ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ, নবাব কিংবা প্রশাসনের ইতিহাস নয়; এটি সাধারণ মানুষেরও ইতিহাস। রিকশার ঘণ্টা, সদরঘাটের নৌকা, চকবাজারের ইফতার, শাঁখারীবাজারের অলিগলি, পুরান ঢাকার খাবার, বায়তুল মোকাররমের মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর—সব মিলিয়ে ঢাকা একটি জীবন্ত ইতিহাস। এই শহরের একদিকে মুঘল ঐতিহ্য, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক স্থাপত্য; একদিকে পুরান ঢাকার সরু গলি, অন্যদিকে আধুনিক নগরীর উঁচু ভবন। সময়ের সঙ্গে ঢাকা বদলেছে, তার চেহারা বদলেছে, জনসংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক আজও অটুট রয়েছে।
বুড়িগঙ্গার তীরের সেই প্রাচীন জনপদ আজ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মহানগর। তাই ঢাকা শুধু বাংলাদেশের রাজধানী নয়—এটি আমাদের স্মৃতি, সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও ভালোবাসার শহর। আমার ঢাকা, প্রিয় ঢাকা—যার ইতিহাসে মিশে আছে বাংলার বহু শতাব্দীর পথচলা। ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্য ও ঢাকাবাসীর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে’ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ১লা আগস্টকে ঢাকা দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করেছে। তাদের উদ্যোগে ৩১ জুলাই থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী “হৃদয়ে ঢাকা” অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। লালবাগ কেল্লায় উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই দিনে ‘ঢাকা হেরিটেজ ম্যারাথন’ এবং ‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ পরিচ্ছন্নতা ও বৃক্ষরোপণ অভিযানের সূচনা হবে। উক্ত অনুষ্ঠানের সফলতা কামনা করে প্রিয় ঢাকাকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখার অভিযাত্রায় শরীক হই।

ঢাকার গোড়াপত্তন কেবল একটি নগর বা শহরের জন্মের গল্প নয়—এটি একটি জনপদের ধীরে ধীরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানীতে পরিণত হওয়ার এক অনবদ্য, গৌরবময় ও বিস্ময়কর ইতিহাস। বুড়িগঙ্গার তীরের সেই প্রাচীন জনপদ সময়ের প্রবাহে মুঘল রাজধানী, নবাবি ঐতিহ্যের কেন্দ্র, ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক নগর এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ঢাকার প্রতিটি ইট, প্রতিটি স্থাপনা, প্রতিটি অলিগলি যেন বহন করে চলেছে এই দীর্ঘ ইতিহাসের নানা অধ্যায়। তাই ঢাকা শুধু একটি শহর নয়—এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

লেখক: কলামিস্ট ও সমাজকর্মী

আরো