পুলিশ লাইনের ভেতরে ঢুকে মাদারাসার ছাত্রদের হামলা আহত-৩০ তদন্ত কমিটি গঠন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
মঙ্গলবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উচ্চস্বরে গান-বাজনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সাথে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের রাতভর উত্তেজনা, হামলা ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটেছে।
এমন পরিস্থিতিতে পন্ড হয়ে যায় জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১ টার দিকে শহরের পশ্চিম মেড্ডার পুলিশ লাইন্সের ভেতরে এই ঘটনা ঘটে। হামলা ও লাঠিচার্জের ঘটনায় মাদরাসার শিক্ষার্থী ও পুলিশসহ কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ২৪জন মাদরাসার শিক্ষার্থী ও ৬জন পুলিশ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোঃ ওবায়দুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন ও ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ লাইন্সে গেইটে এবং কম্পাউন্ডে ডিউিটিতে বিচ্যুতির কারনে তিন পুলিশ সদস্যকে সকল দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তবে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ও সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সাথে কথা বলার জন্য কয়েকদফা ফোন করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুলিশ সদস্য, মাদরাসার শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর সাথে তার স্ত্রী ও পুনাক উপদেষ্টা সিদারাতুল মুনতাহা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেন।
তাদের আগমন উপলক্ষে পুলিশ লাইন্সের ভেতওে রাতের বেলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
জাসাসের সহযোগিতায় রাতের বেলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলে এখানে উচ্চস্বরে গান বাজনা হওয়ায় পুলিশের লাইন্সের পাশে থাকা দারুল আরকাম মাদরাসার শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে অনুষ্ঠানে গানের সাউন্ড কমাতে বলে।
তাদের কথা শুনে প্রথমে অনুষ্ঠানের সাউন্ড কমানো হলেও পরে আবারো সাউন্ড বাড়িয়ে উচ্চস্বরে গান বাজনা শুরু হয়। এ নিয়ে পুলিশের সাথে মাদরাসার ছাত্রদের বাক-বিতন্ডা শুরু হয়। খবর পেয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী আবার পুলিশ লাইন্সের ভিতরে প্রবেশ করে। এ সময় পুলিশ ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনতে লাঠিচার্জ শুরু করে। জবাবে মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও ঢিল ছুড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে পুরো পুলিশ লাইন্স এলাকার ভেতরে এবং বাইরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে মাদরাসার শিক্ষার্থী ও পুলিশ সহ ৩০ জন আহত হয়।
দারুল আরকাম মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বুধবার তাদের মাদরাসায় পরীক্ষা আছে। উচ্চস্বরে গান বাজনার কারণে তাদের সমস্যা হচ্ছিল। তাই প্রথমে তারা কয়েকজন পুলিশ লাইন্সের ভিতরে গিয়ে উচ্চস্বর কমানোর জন্য বলে। প্রথমে সাউন্ড কমানো হলেও পরে আবার বাড়িয়ে দেয়া হয়। এ নিয়ে পুলিশের সাথে তাদের বাক-বিতন্ডা শুরু হলে পুলিশ লাঠি চার্জ করে ছাত্রদের আহত করে।
আহত শিক্ষার্থীদেরকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতাল সহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
খবর পেয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজের নেতৃত্বে দলীয় নেতা-কর্মীরা হাসপাতালে ছুটে যান। এ সময় তারা আহত শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর নেন এবং এর চিকিৎসায় সর্বোচ্চ সহায়তা আশ্বাস দেন।
এদিকে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে গভীর রাতে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা শহরের বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরে প্রেস ক্লাবের সামনে এসে প্রতিবাদ সভা করেন। প্রতিবাদ সভা থেকে এই ঘটনার সাথে জড়িত সকল পুলিশের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করা হয়।
এদিকে রাত ৩টার দিকে পুলিশ সুপার শাহ মোঃ আব্দুর রউফ দারুল আরকাম মাদরাসায় ছুটে যান। সেখানে জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ সিরাজুল ইসলাম, দারুল আরকাম মাদরাসার অধ্যক্ষ ও হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানের উপস্থিতিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে ৫দফা দাবি জানানো হয়।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাদরাসায় গিয়ে পুলিশ সুপার শাহ্ মো.আব্দুর রউফ জানান,” আজকে জেলা পুলিশ লাইনের যে অনুষ্ঠানটি ছিল, “সেখানে আমাদের কালচারাল প্রোগ্রাম ছিল। পাশাপাশি হওয়ার কারণে শব্দের জন্য মাদরাসার ছাত্রদের সমস্যা হয়েছিল এবং এটাকে কেন্দ্র করে একটি অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে। আসলে এটি একটি ভুল বোঝাবুঝি ছিল। এখানে যারা জড়িত বা যাদের অতিউৎসাহী ভূমিকা ছিল, আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যাতে স্বচ্ছভাবে অ্যানালাইসিস করতে পারি, সে বিষয়ে আমরা স্বচ্ছতা রাখব। এখানে আমরা যাদের সঙ্গে বসেছি, সবার সাথে কথা হয়েছে এবং খুবই ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বাকি যারা অসুস্থ বা চিকিৎসাধীন আছে, ইতিমধ্যে জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ ভাই হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিয়েছেন, তাদেও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের চিকিৎসার জন্য যত আর্থিক বা উন্নত চিকিৎসা লাগবে, সেটা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আমরাও সহযোগিতা করব যা লাগে।
পাশাপাশি এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত বা অতিউৎসাহী হয়ে অনভিপ্রেত পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
একটু ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির কারণে এখানে অনেক বাচ্চা আহত হয়েছে । এটা আসলেই প্যাথেটিক। এটার জন্য খারাপ লেগেছে। যারা জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে। এ নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে, যার সাথে ছাত্র প্রতিনিধিরাও যুক্ত থেকে স্বচ্ছতার সাথে বিষয়টি অ্যানালাইসিস করবেন এবং বিচার নিশ্চিত করা হবে।
অপর এক ভিডিওতে দেখা যায়, দারুল আরকাম মাদরাসার অধ্যক্ষ ও হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান জানান, “জামিয়া দারুল আরকামে আজকে রাত্রে যে একটা অনাকাঙ্খিত দুঃখজনক ঘটনা হয়েছে এর পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ সময় আমাদের এখানে এসপি মহোদয় অবস্থান করেছেন। জেলা পরিষদ প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ ভাই অবস্থান করেছেন। আমরা খোলা আলোচনা করে আমরা একমত হয়েছি, ছাত্রদের পক্ষ থেকে যে দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, সব দাবি উনারা (পুলিশ) মেনে নিয়েছেন।
বিশেষ করে যারা ছাত্রদেরকে আহত করেছে, ভিডিও ফটেজ দেখে তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবেন বলে এসপি মহোদয় আশ্বাস দিয়েছেন। এমতাবস্থায় আমি সমস্ত ছাত্র-ভাইদেরকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওলামায়ে কেরাম ও দেশবাসী যারা এই ঘটনা জানতে পেরেছেন, দুঃখিত হয়েছেন, সবাইকে বলব শান্ত থাকার জন্য। যথাযথ বিচার পাওয়া গেছে এবং বাকিগুলি ভিডিও ফুটেজ দেখে বিচার করা হবে।
এদিকে এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোঃ ওবায়দুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন ও ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ লাইন্সে গেইটে এবং কম্পাউন্ডে ডিউিটিতে বিচ্যুতির কারনে তিন পুলিশ সদস্যকে সকল দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে পুলিশ শাহ মোঃ আব্দুর রউফ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মোঃ ওবায়দুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) রকিব উর রেজা ও সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শহিদুল ইসলামের (ওসি) সাথে কথা বলার জন্য কয়েকদফা ফোন করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।
