শক্তিশালী সিন্ডিকেট ধারা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে নথি গায়েব
জনভোগান্তি নিরসনের দোহাই দিয়ে তড়িঘড়ি করে প্রায় ৫৭ হাজার প্লট ও ফ্ল্যাটের গেজেট প্রকাশ করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে কোনো সুনির্দিষ্ট ও নিবিড় যাচাই-বাছাই ছাড়াই ছয় ধাপে এ গেজেট প্রকাশ করা হয়। এতে মামলা-সংক্রান্ত বিরোধ, লিজ দলিলে মারাত্মক ত্রুটি, জাল আমমোক্তারনামা এবং ব্যাংকে বন্ধক থাকা সম্পত্তি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রকৃত মালিক ও উত্তরাধিকারীরা চরম আইনি অনিশ্চয়তা ও হয়রানির মুখে পড়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ব্যাংকে বন্ধক রাখা এবং মামলায় বিচারাধীন সম্পত্তিকেও ভুয়া কাগজপত্রে ‘নিষ্কণ্টক’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ধানমন্ডির কয়েকশ কোটি টাকার প্লটসহ একাধিক মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বাগিয়ে নিতে মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভূঁইফোড় সিন্ডিকেট একজোট হয়ে একদিনের মধ্যে ফাইল অনুমোদন এবং ১৬ বছরের মূল নোটশীট গায়েব করার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছে। ভুল তথ্যে ভরা এসব গেজেটের কারণে একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব হাতছাড়া হচ্ছে, অন্যদিকে সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়গুলোতে তৈরি হয়েছে জালিয়াতি ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য। যার কারণে এখন প্লটের প্রকৃত মালিক, বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং উত্তরাধিকারীরা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৭ নম্বর রোডের ১০২ (পুরাতন), ৩৩/এ (নতুন) প্লটটি ডিজাইনার ডেভেলপার্স এন্ড বিল্ডার্স লিমিটেড দশ তলা ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে প্লটের মালিক ইসমত আরা মোকাদ্দেম, আমের মোকাদ্দেম ও আসেম মোকদ্দেম থেকে ২০১০ সালের ২৮ জুন এবং ৫ জুলাই রেজিস্টার্ড ডেভেলপমেন্ট চুক্তি ও বায়না দলিল সম্পন্ন করে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য আবেদন করে। চুক্তির আওতায় মালিকদের ৭ কোটি টাকা সাইনিং মানি দেয় ডেভেলপার কোম্পানি। পরবর্তীতে ভবন নির্মাণ প্ল্যান পাশের উদ্দেশ্যে রাজউকে আবেদন করলে, ডেভলপার কোম্পানি জানতে পারে ‘জাতির পিতা পরিবারের নিরাপত্তা আইন ২০০৯’ এর আওতায় সুধাসদনের ২৫০ মিটারের মধ্যে ছয় তলার বেশি উচ্চতায় ভবন নির্মাণ করা যাবে না। পরবর্তীতে জমির মালিককে জানানো হলে তারা আপত্তি জানালে উভয়পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। বিরোধ থাকাবস্থায় ডেভলপার কোম্পানির অনাপত্তি ছাড়াই আকরাম নামের এক ভূমি দস্যুর পৃষ্ঠপোষকতায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উন্নয়ন অধিশাখা-৭ এর যুগ্ম সচিব মো. মনিরুজ্জামান, শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম, অফিস সহায়ক মনোতোষ দাস ও অন্তবর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা সোহেল মিয়ার যোগসাজস্যে ২০২৫ সালের ৪ জুন একদিনে পাঁচটি কাজ সম্পন্ন করে আকরামের নামে প্লট দলিল করে দেওয়া হয়। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্লটটি ‘নিষ্কণ্টক’ দেখিয়ে গেজেটভুক্তও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তৎকালীন যুগ্মসচিব মনিরুজ্জামান ও সোহেল মিয়ার গ্রামের বাড়ি একই এলাকায়। সেজন্য সোহেলের মিয়ার সঙ্গে মনিরুজ্জামানের সু-সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্লট জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশে আসায় সোহেল মিয়াকে দুষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেন মনিরুজ্জামান।
ধানমন্ডির ২৫২ ও ১০২ নম্বর প্লট জালিয়াতির সময়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উন্নয়ন অধিশাখার-৭ যুগ্মসচিবের দায়িত্বে ছিলেন মো. মনিরুজ্জামান মিঞা। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার। মো. মনিরুজ্জামান মিঞা, তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, প্লটের নথির আলোকে স্বাক্ষর করেছি, ফাইল থেকে কোনো নথি গায়েব কিংবা জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে সেটির সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জড়িত থাকতে পারেন। এদিকে গণপূর্তের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেছেন, উধ্বর্তন কর্মকর্তার নির্দেশনা ছাড়া কোনো ফাইলের নথি গায়েব কিংবা জালিয়াতির ক্ষমতা প্রশাসনিক কর্মকর্তার হাতে থাকে না।
সরেজমিন তদন্ত করে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৪ জুন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখা-৭ এর উল্লেখিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজস্যে ধানমন্ডির ১০২ (পুরাতন), ৩৩/এ (নতুন) প্লটের অপ্রত্যহারযোগ্য পাওয়ার অফ অ্যটর্নি অনুমোদনের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন আসেম মোকাদ্দাম এবং তার অনুমোদনও সম্পন্ন হয়। একইদিনে প্লট হস্তান্তর ও নামজারির আবেদন করেন। ওই দিনেই হস্তান্তর ও নামধারী অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়। একইদিনে অনুমোদনের কপি ধানমন্ডি সাব রেজিস্ট্রি অফিসে পৌঁছে যায়। জালিয়াতি চক্রের মাধ্যমে একদিনেই প্লটটি ২১২৫ নম্বর সাব-কবলা দলিল মো. আকরামের নামে করা হয়।
ডেভলপার কোম্পানির চুক্তি ও অপ্রত্যহারযোগ্য পাওয়ার অফ অ্যাটর্নির তথ্য গোপন করে একদিনের মধ্যে নতুন পাওয়ার অনুমোদন, বিক্রয় পারমিশন, নামজারি, বিক্রয় দলিল সম্পন্ন করে তৃতীয় একটি পক্ষকে প্লট বাগিয়ে দেওয়ার সহযোগিতা করে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। জালিয়াতি চক্রের বিষয়টি বুঝতে পেরে ডেভেলপার কোম্পানি ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখা ৭-এর যুগ্ম সচিব বরাবর আবেদন করে। মন্ত্রণালয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা শাখা-১ (সাবেক উন্নয়ন অধিশাখা-৭) হতে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর ২৬১ নম্বর স্মারকে ইসুকৃত শুনানি নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ডিজাইনার ডেভেলপার্স এন্ড বিল্ডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফখরুল আলম সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শুনানিতে উপস্থিত হন। ওই শুনানিতে তিনি লিখিত বক্তব্যে তার অভিযোগ বা আপত্তিগুলো পেশ করেন অথচ এই শুনানির আপত্তি নিষ্পত্তি না করেই ধানমন্ডি প্লট ১০২(পুরাতন), ৩৩ (নতুন) ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ‘নিষ্কণ্টক’ দেখিয়ে গেজেটভুক্ত করা হয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দক্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করলে তারা জানান, এটা শুধু একটি দুর্নীতি ও প্রতারণা নয় এটা একটি মহা-দুর্নীতি ও মহাপ্রতারণা। এর দায় মন্ত্রণালযয়ের সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগ ও শাখার কর্মকর্তারা কোনভাবেই এড়াতে পারে না।
এদিকে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৩৫২/বি (পুরাতন) ২১ (নতুন), রোড ২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন) প্লটে লিজ দলিলে জমি ১৮.২৫ কাঠা। কিন্তু, বরাদ্দকৃত এবং হস্তান্তরিত মেথর প্যাসেজ ১.৪১ কাঠাসহ প্লটে জমির পরিমাণ ২২.৯১ কাঠা হয়েছে। লিজ দলিলের চেয়ে প্লটে ৪.৬৬ কাঠা জমি বেশি। এছাড়াও পশ্চিমাংশের মেথর প্যাসেজের জমিসহ ১২.৯১ কাঠা ও ৫ কাঠা হিসেবে ২টি উপ-প্লটে বিভক্ত করা হয়েছে। প্লটটি মোট ৩ অংশে বিভক্ত। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, প্লটের পূর্বাংশে ১০.২ কাঠা জমি, যা লিজ দলিল সম্পাদিত জমির পরিমাণ অপেক্ষায় ৩.৭৭ কাঠা বেশি আছে। প্লটের ১০.৫৯ কাঠা জমি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ধানমন্ডির পাশাপাশি খিলগাঁও পুনর্বাসন এলাকার ব্লক- ‘এ ’ও ‘বি’ এর নথির তালিকায় বহু প্লটের মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা, বরাদ্দ পেলেও লিজ দলিল কিংবা খণ্ড জমির লিজ দলিল হয়নি। এরপরও ত্রুটিপূর্ণ প্লটগুলো রাতারাতি নিষ্কণ্টক দেখিয়ে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গেজেটে অন্তর্ভুক্ত প্লটের তালিকা প্রকাশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে ভূমি শাখা ১ ও ২ এর অধীনে ধানমন্ডি ও খিলগাঁওয়ে। ত্রুটিপূর্ণ সম্পত্তি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নতুন করে আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখা-৮ এর নথিতে দেখা গেছে, খিলগাঁও পুনর্বাসন এলাকার বহু প্লট দখল কিংবা লিজ দলিল হয়নি। খিলগাঁও পুনর্বাসন এলাকার ‘এ’ ব্লকের ‘এ/৫৪৭’
দুই কাঠার প্লটটি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক বনানী কর্পোরেট শাখার নিকট দায়বদ্ধ। এরপরও গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, প্লটের সামনে বড় করে ব্যাংকের সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ওই সাইনবোর্ডে ব্যাংক স্পষ্ট করে লেখেছে- প্লটটি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ। প্লটের চারপাশে বহুতল ভবন গড়ে উঠলেও সেখানে টিনসেট, তাও ভাঙাচুরা অবস্থা।
জানা গেছে, ব্যাংক ঋণে দায়বদ্ধ বা বন্ধকীকৃত কোনো প্লট বা জমি আইনগতভাবে ‘নিষ্কণ্টক’ নয়। ভূমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনে ‘নিষ্কণ্টক সম্পত্তি’ এবং ‘দায়বদ্ধ সম্পত্তি’বলা হয়েছে, কোনো জমিকে তখনই নিষ্কণ্টক বলা হয়, যখন জমিটির মালিকানা সংক্রান্ত কোনো আইনি বিরোধ বা মামলা-মোকদ্দমা নেই। জমিটির ওপর কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা তৃতীয় পক্ষের কোনো প্রকার দাবি, দায়, বা বন্ধক থাকে না। জমিটি কেনাবেচা বা হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা থাকে না। যখন কোনো প্লট ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া হয়, তখন ওই প্লটের ওপর ব্যাংকের একটি আইনগত অধিকার বা “দাবি সৃষ্টি হয়। বন্ধক রাখার সময় জমির মূল দলিল ব্যাংকের কাছে জমা থাকে। তখন ব্যাংকের লিখিত সম্মতি বা অনাপত্তি সনদ ছাড়া এই ধরনের প্লট বিক্রি, দান বা হস্তান্তর করা আইনত দণ্ডনীয় এবং অবৈধ। এরপরও খিলগাঁও পুনর্বাসন এলাকার ‘এ’ ব্লকের ‘এ/৫৪৭’ প্লটটি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গেজেটের কর্মকাণ্ডে সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি প্লট ও ফ্ল্যাটের নথিপত্র পৃথকভাবে যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ ছিল না। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে বরাদ্দ দেওয়া প্লট ও ফ্ল্যাটের বিপুল পরিমাণ নথি একসঙ্গে পর্যালোচনা করতে গিয়ে অনেক তথ্য যথাযথভাবে মিলিয়ে দেখা সম্ভব হয়নি। তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশের পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ মহলের তৎপরতা ছিল। এর ফলেই বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ নথির কিছু প্লট গেজেটে স্থান পেয়েছে। এই অনিয়ম, জালিয়াতি ও টাকার ভাগবাটোয়ার সঙ্গে অন্তবর্তী সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার আশেপাশের কয়েকজন ও মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ্য ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।
দেখা গেছে, রাজধানীর খিলগাঁও পুনর্বাসন এলাকায় কয়েক দিনের মধ্যে চার ধাপে ২ হাজার ২৩৭টি প্লটের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বনানী ৫৭৪টি, গুলশানে ১ হাজার ১৬১টি, উত্তরা ৬ হাজার ৬০৭টি, উত্তরা তৃতীয় পর্ব (সেক্টর-১৫, ১৬, ১৭) ৫ হাজার ২৮১টি, ধানমন্ডি ৫৯৬টি, নিকুঞ্জ ৬৩৪টি, শ্যামপুর ১৪৯টি, ঝিলমিল প্রকল্পে ১ হাজার ১২টি এবং পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ৯ হাজার ৫০৪টি প্লট গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। প্লটের পাশাপাশি উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের (সেক্টর-১৮) ২ হাজার ৫১টি ফ্ল্যাট গেজেটে রয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) আওতাধীন লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের বিভিন্ন সরকারি ফ্ল্যাট প্রকল্পের ৭৩৯টি ফ্ল্যাট, মিরপুরের রূপনগর সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকার ১৫৩টি প্লট, মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের ৪৫টি বাড়ি এবং হাউজিং এস্টেটের ৪৩০টি প্লটও নিষ্কণ্টক তালিকায় স্থান পেয়েছে। এছাড়াও ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে ৫ হাজার ৭১৬টি প্লট ও ৪৮টি ফ্ল্যাট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, গোপালগঞ্জ, মাগুরা ২২৮টি প্লট, নড়াইল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও শরীয়তপুরে ১৯২টি প্লট, টাঙ্গাইল ১৬৭টি প্লট, রাজশাহী ১১৩টি প্লট, যশোর ৬টি প্লট এবং খুলনা ৪টি প্লট গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এভাবে ছয় ধাপে ৫৬ হাজার ৯৭৪টি প্লটের গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে। জালিয়াতি ও ত্রুটি-বির্চ্যুতির কারণে ২০০৬ সালে প্লট ও ফ্ল্যাট গেজেটে প্রকাশের কয়েক মাস পরে তা বাতিল করা হয়েছিল।
পদে পদে গেজেট ভুল, সুরাহা খুঁজতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মানুষ: তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ করায় প্লট ও ফ্ল্যাট মালিকদের ভোগান্তি বেড়েছে কয়েকগুণ। প্লটের তথ্য সংশোধনে আবদনের হিড়িক পড়েছে। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার প্লট ৩৫১ (দক্ষিণ-উত্তর) (পুরাতন), ১৮ ও ১৮এ (নতুন প্লট নম্বর ১৯৯ (পুরাতন) ৫০,৫০/এ (নতুন), প্লট ১৯৯ (পুরাতন) ৫০, ৫০/এ, প্লট ১৪৮/বি (পুরাতন), ৫০ (নতুন), প্লট ৭২/এ (পুরাতন) ১১ (নতুন), প্লট ৫২৯ (পুরাতন) ৪১/এ (নতুন), প্লট ৭৮৮ (পুরাতন) ১২২ (নতুন), ১২৪ (পুরাতন) ২৬৯ (নতুন), প্লট ৩৭৭/এ (পুরাতন) ৮ (নতুন), প্লট ৫০০/বি (পুরাতন) ১৬ (নতুন), প্লট ৩৮৭ (পুরাতন) ৫ (নতুন), প্লট ৭২১ (পুরাতন) ৭৯ (নতুন), প্লট ৭৩০ (পুরাতন) ৯/এ (নতুন), প্লট ৫৬৯ (পুরাতন) ৬১ (নতুন), প্লট ১৪৮/বি (পুরাতন) ৫০ (নতুন), প্লট ১৭১/বি (পুরাতন) ৩৯ (নতুন), প্লট ১৮৭/এ (পুরাতন) ৫১ (নতুন), প্লট ৩০১/বি (পুরাতন) ২৮ (নতুন), প্লট ৫৮৮ (পুরাতন) ৬২০ (নতুন), প্লট ৬৩৮ (পুরাতন) ৭৯ (নতুন), প্লট ৬০৭ (পুরাতন) ২৭/বি (নতুন), প্লট ১৪৯/এ (পুরাতন) ৫৫ (নতুন) এবং ৫২৪ (পুরাতন) ৬ (নতুন) প্লটসহ বহু প্লটের তথ্য গেজেটে ভুলভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত গেজেটে তথ্য ভুলে পদে পদে হয়রানিতে পড়েছেন মানুষ।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম ও হয়রানির আশঙ্কা: ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্লট মালিকদের ভোগান্তি নিরসনে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু এখন দেখি পদে পদে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আগে প্লট হস্তান্তরের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল করা যেত। কিন্তু এখন গেজেটে প্লটের তথ্য ভুলে ভরা, সংশোধনের জন্য এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দলিল নিবন্ধন বা নামজারি প্রক্রিয়াও আটকে যাচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়ছেন গ্রাহকরা।
এছাড়াও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোয় অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়া, প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রিতে নতুন বিড়ম্বণা তৈরি হয়েছে। এই আদেশ দ্বৈত দলিল, ওয়ারিশন ফাঁকি, জাল দলিল তৈরির সুযোগ তৈরি হবে। মূল ফাইল সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে না থাকায় তা যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর এবং তার আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। সেই অনুযায়ী, একজন সাব-রেজিস্ট্রার শুধু কাগজে স্বাক্ষর দেখে দলিল রেজিস্ট্রি করতে পারেন না। তার দায়িত্ব—দলিলের দাতা বা বিক্রেতাই জমির প্রকৃত মালিক কিনা, জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর এবং নামজারি সঠিক আছে কি না, তা যাচাই করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সাব-রেজিস্ট্রাররা কেবল দাতা-গ্রহীতার উপস্থিতি এবং কাগজে তথ্যের মিল দেখেই দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন। দলিল লেখকের তৈরি করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সম্পন্ন হয় পুরো প্রক্রিয়া। ফলে তৈরি হয় জালিয়াতির এক বিশাল সুযোগ। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্লট ও এর আওতাধীন সংস্থাগুলোর প্লট ও ফ্ল্যাটের গেজেটভুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের ম্যানেজ করে দলিল করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে দালালদের।
আর্থিক টানাপোড়েন : গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের কোন মন্ত্রণালয় নিজেদের আয়েত্বে থাকা সম্পত্তি বেহাত করতে দেয় না। কিন্তু, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলার মিলিয়ে প্রায় ৫৬ হাজার ৯৭৪টি প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়ি নিষ্কণ্টক তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। দলীয় সরকারের আমলে নিষ্কণ্টক তালিকায় প্রকাশে মন্ত্রণালয় ও বাইরের সিন্ডিকেট সফলতা না হলেও অন্তবর্তী সরকারের আমলে কাঙ্ক্ষিত স্বার্থ হাসিল করতে পেরেছে চক্রটি। ‘নিষ্কণ্টক তালিকা’হাজির করে তড়িঘরি করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। ‘নিষ্কণ্টক তালিকা’হওয়ার আগে বরাদ্দপ্রাপ্ত প্লট ও ফ্ল্যাট চূড়ান্ত লিজ ডিড সম্পন্ন হওয়ার আগেই আমমোক্তারনামার মাধ্যমে হাতবদল হতো এবং এর বিপরীতে সংস্থাগুলো বিভিন্ন ফি ও চার্জ আদায় করতো। প্রজ্ঞাপনের কারণে এখন এই উৎস থেকে আসা রাজস্ব পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্লট ও ফ্ল্যাট হস্তান্তর বাবদ আয় কমেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক)।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় পরিসরে গেজেট প্রকাশের আগে প্রতিটি নথির ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল উভয় পর্যায়ে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে লিজ দলিল, বরাদ্দপত্র, নামজারি, আদালতে বিচারাধীন মামলা এবং পূর্ববর্তী প্রশাসনিক আদেশের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত না করে গেজেট প্রকাশ করায় জটিলতা বাড়ছে।
শত কোটি টাকার প্লট জালিয়াতি, তদন্ত প্রতিবেদনে দায়সারা : গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাষ্ট্রীয় পরিত্যক্ত সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট ভূমি ব্যবস্থাপনা শাখার কর্মকর্তাদের যোগসাজস্যে ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে ভুয়া আমমোক্তারনামা অনুমোদন করে প্লট বাগিয়ে নিতে নিষ্কণ্টক তালিকা করে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সবচেয়ে বড় জালিয়াতি করা হয়েছে, রাজধানীর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২৫২ নম্বর (পুরাতন)/৭১ নম্বর (নতুন), সড়ক ১২/এ প্লটে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজস্যে শত কোটি টাকার প্লটটি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্লট জালিয়াতির আদ্যোপান্ত বের করতে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনু বিভাগ) মো. আব্দুল মতিন’কে আহবায়ক করে উপসচিব (প্রশাসন শাখা-৮) মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল ও উপসচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা-৬) রুবায়েত হায়াত শিপলু’কে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আদেশ জারি করা হলেও তদন্তে আসে চরম উদাসীনতা। সাত দিনের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে সময় লাগে প্রায় ছয় মাস। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে ধানমন্ডি ২৫২ প্লট পরিদর্শনে গিয়েছিলেন কমিটির সদস্যরা। সেখানে তদন্ত কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্লট বাগিয়ে নেয়া ভূমি দস্যুদের এজেন্ট ছিলেন। তিনি পরিদর্শক টিমের সদস্যদেরকে ঘুরিয়ে ঘুরেয়ে প্লটটি দেখান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ধানমন্ডি ২৫২ প্লট জালিয়াতির সঙ্গে যার জড়িত তাদেরকে বাঁচিয়ে দিতে দায় সারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় থেকে নথি গায়েব: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ঘটনা জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ধানমন্ডি আবাসিক ২৫২ নম্বর প্লট গেজেটভুক্ত করার চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচিত হয়। তৎকালীন উন্নয়ন অধি-শাখা-৭ (বর্তমান ভূমি ব্যবস্থাপনা শাখা-১) এর থেকে বদলিকৃত অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামের যোগসাজস্যে ২৫২ নম্বর প্লটের বিগত ১৬ বছরের (২০১০ সালের পরবর্তী) সকল নথিপত্র গায়েব করার এক ভয়াবহ অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে। রফিকুল ইসলামের জালিয়াতি বুঝতে পেরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে বদলি করে পরিকল্পনা শাখায় দেওয়া হয়েছে। ওইসময়ে উন্নয়ন অধিশাখার-৭ যুগ্মসচিবের দায়িত্বে ছিলেন মো. মনিরুজ্জামান মিঞা। পরবর্তীতে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে ভূমি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের দায়িত্বে আসেন। বর্তমানে মনিরুজ্জামান মিঞা ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার।
জানা গেছে, গেজেটে জালিয়াতির প্লট অন্তর্ভুক্তির পেছনে অন্তবর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যক্তিগত কর্মকর্তার সোহেল মিয়া (প্রশাসনিক কর্মকর্তা) ও তৎকালীন উন্নয়ন অধি শাখার-৭ (বর্তমানে ভূমি ব্যবস্থাপনার শাখা-১) এর অফিস সহায়ক মনোতোষ দাস, তৎকালীন উন্নয়ন অধিশাখা-৭ (বর্তমান ভূমি ব্যবস্থাপনা শাখা-১) এর সদ্য বদলিকৃত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামের জোগসাজোস্যে সরকারি প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ২৫২ নম্বর (পুরাতন), ৭১নম্বর (নতুন)সড়ক ১২/এ বিশ কাঠা প্লটটি ভূমিদস্যুদের বাগিয়ে দেয়ার কাজ শুরু করে । ভূমি ব্যবস্থাপনা শাখা-১ এর প্রশাসনিক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামকে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা-৫ বদলির দুই দিন পরেই একই শাখার নাজমুল হুদাকেও বদলি করা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রটির মূলহোতা রফিকুল ইসলাম (প্রশাসনিক কর্মকর্তা) অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও পরিকল্পিতভাবে মন্ত্রণালয়ের মূল ফাইল থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সরিয়ে ফেলে। পরবর্তীতে ২০১০ সালে প্রাপ্ত আইন মন্ত্রণালয়ের একটি মতামতের নথিপত্র প্লট বাগানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সেই অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ২০২৫ সালে বিতর্কিত প্লটটি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয় চক্রটি। তবে ২০২৬ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। তদন্ত কমিটি গঠন করা না হলে এই বিশাল দুর্নীতির প্রকৃত সত্য চিরতরে চাপা পড়ে থাকত এবং হারিয়ে যাওয়া নথিপত্র উদ্ধারের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হতো না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে কোনো রেকর্ড না পেয়ে তদন্ত দল গণপূর্ত অধিদপ্তরের দ্বারস্থ হয়। শেষপর্যন্ত গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর সহযোগিতায় বিভিন্ন সময়ে অধিদপ্তর জমা থাকা ২৫২ প্লটের গায়েব হওয়া ৫১ পৃষ্ঠার নোটশীট পাওয়া যায়। এই নথির মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয় যে, প্লটটি অবৈধভাবে আত্মসাৎ ও গেজেটভুক্ত করার উদ্দেশ্যেই সিন্ডিকেটটি মন্ত্রণালয়ের ফাইল থেকে মূল নোটশীটগুলো গায়েব করেছিল।
মন্ত্রণালয়ের ২৫২ প্লটের গেজেটভুক্ত করা হলেও পরবর্তীতে তা বাতিল করা হয়। প্লট গেজেট থেকে বাতিল করার পরেও প্লট বাগিয়ে নেয়া চক্রকে শান্ত্বনা দিতে মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট শাখা তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব (বর্তমানে উপসচিব) মোহাম্মদ কায়সার খসরু’র স্বাক্ষরিত চিঠিতে প্লটটির গেজেটভুক্ত করানোর নির্দেশিত একটি চিঠি প্রকাশ্যে আসে। চিঠির সত্যতা যাচাই করতে প্রতিবেদক ওই কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রি খাতা খতিয়ে দেখেন, এ ধরনের কোন চিঠি দেননি এবং রেজিস্ট্রি খাতাও তালিকাভুক্ত হয়নি। তবে গুঞ্জন রয়েছে প্লট বাগানো ভূমিধসুদের শান্ত্বনা রাখার জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনা শাখা থেকে এই ভুয়া চিঠিটি তৈরি করা হয়। সেখানেও সন্দেহের তীর পাওয়া যায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের দিকে। প্লট গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার এই অনিয়মের পেছনে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বাইরের কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জড়িত।
আমমোক্তারনামা বাতিলের সুপারিশ: ধানমন্ডি ২৫২ প্লটের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বাঁচিয়ে দিয়ে দায় সারা প্রতিবেদনের পর আমমোক্তারনামা বাতিলের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি কোন ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনেকেরই মতামত এত বড় জালিয়াতির পর যদি অপরাধীরা কোন ধরনের শাস্তি ছাড়া পার পেয়ে যায়, তাহলে মন্ত্রণালয় এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা বাড়তেই থাকবে। অপরাধ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা এ সকল তদন্ত কমিটির উপর মানুষ আস্থা হারাবে।
কর্মকর্তা বদলিতে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট: প্লটের নথি গায়েবের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলির বিষয়েও এই সিন্ডিকেট কাজ করে। পছন্দসই শাখা বা অধি-শাখায় পদায়নের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের বাইরে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সুপারিশ করা হলে আচমকাই ফাইল আটকে যায়, এই অদৃশ্য শক্তির স্পর্শে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগে ভূমি ব্যবস্থাপনার শাখা-১ এ পদায়নের জন্য একজন সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তার সুপারিশ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার উদ্দেশ্যে রওনা দিলে সিন্ডিকেটের বেড়াজালের চেক পোস্টে হাইড্রোলিক ব্রেক খাওয়ার মত করে আটকে যায়। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে আরও একাধিক সিনিয়র ব্যক্তিগত কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও।
এসব বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর কালবেলাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তড়িঘড়ি করে ৫৬ হাজার ৯৭৪টি প্লটের গেজেটে প্রকাশ করার পেছনে বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, সেটি চুলছেঁড়া বিশ্লেষণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিগত ১৭ বছরে মন্ত্রণালয়ে বিভিন্নভাবে দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত হবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
ত্রুটিপূর্ণ প্লট গেজেটে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ওবায়দুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘আমার সময়কালে প্লট ও ফ্ল্যাটের গেজেট প্রকাশ হয়নি। গেজেটে ত্রুটিপূর্ণ প্লট ও ফ্ল্যাট অন্তর্ভুক্ত হলে ফের রিভিউ করা হবে। এখানে অনিয়মের কোন সুযোগ নেই।’
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারি অধ্যাপক তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্লট ও ফ্ল্যাট বহুমূল্যবান হওয়ায় কাউকে লাভবান করতে তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এসব কাজের পেছনে এক বা একাধিক চক্র কাজ করেছে। গেজেটে অন্তর্ভুক্ত সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে ভবিষ্যতে আইনগত জটিলতা তৈরি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্লটের গেজেট প্রকাশের আগে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এতো ধাপ অতিক্রম করেও কেন, গেজেটে ত্রুটিপূর্ণ প্লট অন্তর্ভুক্ত হবে। এরসঙ্গে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যে প্লট গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা নয়, সেই প্লট কিভাবে গেজেটে এলো, তা খুঁজে বের করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দ্বারায় তদন্ত কমিটি গঠন করায় একজন আরেকজনকে রক্ষা করেছেন। এতে প্রকৃত সত্য ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। তদন্তে তিনটি বিষয় থাকতেই হয়- ঘটনাটা কেন ঘটল, কারা এরসঙ্গে সম্পৃক্ত এবং কিভাবে সতর্ক থাকা যায়।’
তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বিসিএসে কর্মকর্তারা থাকেন, আবার মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব জনবল আছেন, যাদেরকে মন্ত্রণালয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়। ‘সময়-সুযোগ’ বুঝে অসাধু দুই ধরনের কর্মকর্তা যোগসাজস্য করে অনিয়ম-দুর্নীতি করেন।’ তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে দালালমুক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ- এই সরকারের জন্য। অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই বর্তমান সরকার সফল হবে।’
