বিপ্লবী মুহসনউদ্দীন দুদু মিয়া : নীলকর ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎ

মোহম্মদ তাজুল ইসলাম

উনিশ শতকের (১৮০০-১৮৯৯) বাংলার গ্রামে কৃষকের জীবন ছিল খুব কঠিন। জমিদারের খাজনা, নীলকরের জুলুম আর ব্রিটিশ প্রশাসনের চাপ, সব মিলিয়ে তারা ছিল অসহায়। এই সময়ে যিনি কৃষকদের এক করে প্রতিরোধের পথ দেখিয়েছিলেন, তিনি দুদু মিয়া। ফরায়েজী আন্দোলনের এই নেতাকে আজও মনে রাখা হয় কৃষকের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের জন্য।

দুদু মিয়ার আসল নাম মুহসীনউদ্দীন। ডাকনাম ছিল দুদু মিয়া, আর এই নামেই তিনি পরিচিত হন। ১৮১৯ সালে তৎকালীন ফরিদপুরের শ্যামাইল গ্রামে তার জন্ম, যে জায়গা এখন মাদারীপুর জেলায়। তার বাবা হাজী শরীয়তউল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। দুদু মিয়া ছিলেন তার একমাত্র পুত্র।

ছোটবেলায় বাবার কাছেই তিনি ধর্ম ও সমাজের শিক্ষা পান। প্রায় বারো বছর বয়সে তাকে পড়াশোনার জন্য মক্কায় পাঠানো হয়। সেখানে তিনি পাঁচ বছরের মতো ছিলেন। বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে ঊনিশ বছর বয়সে দেশে ফেরেন এবং বাবার কাজে যোগ দেন।

দুদু মিয়াকে বুঝতে হলে তখনকার সমাজটা দেখা দরকার। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিদাররা খাজনা আদায়ের বিশাল ক্ষমতা পেয়ে যান। কৃষক হয়ে পড়েন শুধুই প্রজা। জমিদাররা ব্রিটিশ শাসনের সহায়ক হয়ে ওঠেন।

আরেক দিকে ছিল ইউরোপীয় নীলকর। তারা কৃষকদের জোর করে নীল চাষ করাত। কম দামে ফসল কিনত, ঋণের জালে ফেলত, আপত্তি করলে মারধর করত। পুলিশ আর আদালতও থাকত তাদের পক্ষে। ফলে গ্রামের মানুষের ওপর একসঙ্গে জমিদার, নীলকর আর প্রশাসনের চাপ ছিল।

১৮৪০ সালে হাজী শরীয়তউল্লাহ মারা যান। এরপর ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্ব আসে দুদু মিয়ার হাতে। বাবার সময় আন্দোলন ছিল মূলত ধর্মীয় সংস্কারের। দুদু মিয়া এটাকে আরও বড় করলেন। কৃষকের অর্থনৈতিক, সামাজিক আর রাজনৈতিক অধিকারের লড়াইও এর সঙ্গে যুক্ত হলো।

তিনি বলতেন, জমির আসল মালিক আল্লাহ, কোনো জমিদার নন। তার আরেকটি কথা ছিল, জমি চাষির। যে জমিতে খাটে, জমির ওপর অধিকার তারই। জমিদারি ব্যবস্থার ভিত্তিতে এই কথা সরাসরি আঘাত করেছিল।

দুদু মিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সংগঠন গড়ার ক্ষমতা। তিনি গ্রামে গ্রামে একটা প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেন, যার কেন্দ্রে ছিল খিলাফত ব্যবস্থা।

ফরায়েজীদের বসতি ও মহল্লাগুলোকে তিনি এলাকা ধরে ভাগ করেন। প্রতিটি এলাকায় থাকতেন একজন গ্রাম খলিফা। তিনি সাধারণ মানুষ আর নেতৃত্বের মধ্যে সংযোগ রাখতেন। কয়েকটি গ্রাম মিলে হতো একটি গির্দ বা সার্কেল, যার দায়িত্বে থাকতেন একজন তত্ত্বাবধায়ক খলিফা।

এই ব্যবস্থায় গ্রামের ঝগড়া-বিবাদ মেটানো, সমাজে শৃঙ্খলা রাখা আর কৃষকদের একজোট রাখা সহজ হয়। তিনি পঞ্চায়েত ব্যবস্থা আবার চালু করেন, যাতে বিবাদ আলোচনা আর সালিশের মাধ্যমে মিটে যায়। জানা যায়, ফরায়েজীদের খলিফার অনুমতি ছাড়া সরকারি আদালতে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল।

দুদু মিয়া বুঝেছিলেন, শুধু ধর্মের কথা বা নীতিকথা দিয়ে জমিদার আর নীলকরদের ঠেকানো যাবে না। তাই তিনি লাঠিয়াল বাহিনী গড়েন। জমিদার-নীলকররা নিজেদের স্বার্থে ভাড়াটে লাঠিয়াল, পেয়াদা আর পুলিশ ব্যবহার করত। দুদু মিয়ার বাহিনী তাদের মোকাবিলা করত। ফলে ফরায়েজী এলাকায় ওই ভাড়াটে বাহিনীর দাপট অনেক কমে যায়। ইতিহাসবিদদের লেখায় পাওয়া যায়, ১৮৩৮ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত এসব এলাকায় তুলনামূলক শান্তি ছিল আর কৃষকদের সংগঠিত প্রতিরোধ টিকে ছিল।

আন্দোলন শক্ত হতে থাকলে জমিদার-নীলকরদের আক্রোশও বাড়তে থাকে। তারা দুদু মিয়াকে বিপজ্জনক মনে করত। কারণ তিনি কৃষকদের ভয় কাটিয়ে আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন।

১৮৪২ সালে ফরিদপুরের জমিদার মদন নারায়ণ ঘোষের সঙ্গে সংঘাতের একটি ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ দুদু মিয়াসহ একশর বেশি ফরায়েজীকে গ্রেপ্তার করে। তবে প্রমাণ না পাওয়ায় দুদু মিয়া ছাড়া পান।

১৮৪৬ সালের অক্টোবরে আরও ভয়ংকর এক হামলা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচচরের জমিদার-পক্ষ নীলকরদের সহায়তায় সাত-আটশ লোক নিয়ে কাঞ্জিলাল বাহাদুরপুরে দুদু মিয়ার বাড়িতে হামলা চালায়। তারা দরজা ভেঙে ঢোকে, পাহারাদারদের মারে, কয়েকজনকে হত্যা করে। প্রায় দেড় লাখ টাকার নগদ অর্থ ও জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনা দেখায়, দুদু মিয়ার বিরুদ্ধে শুধু রাজনৈতিক বিরোধ নয়, সরাসরি সহিংস চাপও ছিল।

দুদু মিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করতেন না। তিনি ছিলেন বাস্তববাদী। আইনের মধ্যে থেকেই কৃষকের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তার আন্দোলনের মূল কথা ছিল ব্রিটিশ-সমর্থিত শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। জমিদার আর নীলকররা যেহেতু ব্রিটিশ শাসনের সহায়ক ছিল, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধেই লড়াই হয়ে দাঁড়ায়।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর ব্রিটিশ সরকার সন্দেহজনক সংগঠনগুলোর ওপর নজর কড়া করে। জমিদার-নীলকরদের অভিযোগের ভিত্তিতে দুদু মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি জেলে যান, পরে ছাড়া পান। কিন্তু জমিদারদের চাপে আবার তাকে বন্দি করা হয়। জেল থেকে বেরোনোর পর তার শরীর অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৮৬২ সালে দুদু মিয়া ঢাকায় মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তার ছোট ছেলেদের দেখাশোনার জন্য একটি অভিভাবক পরিষদ গঠন করে যান। কিন্তু তার পর ফরায়েজী আন্দোলন আর আগের মতো শক্ত থাকেনি।

নেতৃত্বের অভাব, ব্রিটিশ সরকারের দমননীতি আর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আন্দোলন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়। তবে এর চেতনা হারিয়ে যায়নি। বাংলার কৃষক আন্দোলন আর ব্রিটিশবিরোধী চিন্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে এটি থেকে যায়।
দুদু মিয়ার সবচেয়ে বড় কাজ হলো, তিনি কৃষককে শুধু শোষিত মানুষ হিসেবে থাকতে দেননি। তাদের একটা সংগঠিত শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। তার খিলাফত ব্যবস্থা, পঞ্চায়েত আর লাঠিয়াল বাহিনী গ্রামের মানুষকে নিজের ওপর ভরসা করতে শিখিয়েছিল।
তার “জমি চাষির” কথাটা ছিল ভূমি নিয়ে একেবারে নতুন এক ভাবনা। পরে কৃষকের অধিকার, ভূমি সংস্কার আর শ্রমের ভিত্তিতে মালিকানার যে আলোচনা এসেছে, তার সঙ্গে এই ভাবনার মিল পাওয়া যায়। তার আন্দোলনে ধর্মীয় সংস্কার আর সামাজিক প্রতিরোধ একসঙ্গে মিশে ছিল, যা বাংলার ইতিহাসে খুব বিরল।
দুদু মিয়া ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, সংগঠক আর প্রতিরোধযোদ্ধা। তার জীবন দেখায়, সাধারণ কৃষকও এক হলে জমিদার, নীলকর আর ঔপনিবেশিক শক্তির সামনে দাঁড়াতে পারে। তাই যুগে যুগে বাংলার মুক্তির লড়াইয়ের ইতিহাসে তার নাম সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

আরো