আলৌকিক ঘটনায় বিরল সৌভাগ্যবান: হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাযি:)
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
নিখাদ আনুগত্য ও অটল ঈমান* ইসলামের প্রাথমিক যুগের যেসব সাহাবী তাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও নিঃশর্ত আনুগত্যের মাধ্যমে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন—হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ আল-কিন্দি (রা.) তাঁদের অন্যতম। রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও আনুগত্য ছিল প্রশ্নহীন, আর ঈমান ছিল পাহাড়সম দৃঢ়।
*প্রাথমিক জীবন ও ইসলাম গ্রহণ*
হযরত মিকদাদ (রা.) জন্মগ্রহণ করেন ইয়েমেনের হাধরামাউত অঞ্চলের বাহরা গোত্রে। অল্প বয়সেই তিনি নিজ গোত্র ত্যাগ করে মক্কায় আশ্রয় নেন এবং আল-আসওয়াদ আল-কিন্দি নামক এক প্রভাবশালী ব্যক্তির অধীনে বসবাস শুরু করেন। তাঁর অসাধারণ সাহস ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে আল-আসওয়াদ তাঁকে দত্তক নেন। সে সময় আরব সমাজে দত্তক পুত্রকে পিতার নামে ডাকার রীতি ছিল—এভাবেই তিনি পরিচিত হন “মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ” নামে।
২৪ বছর বয়সে রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর নবুয়ত ও তাওহিদের আহ্বান শুনে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামের সূচনালগ্নে কুরাইশদের নির্যাতনের ভয়ে তিনি ঈমান গোপন রাখলেও, পরিস্থিতি কঠিন হলে রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। তিনি ছিলেন মদিনায় হিজরতকারী শেষ দিকের সাহাবীদের একজন।
*রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর সান্নিধ্য ও ঈমানদীপ্ত আলৌকিক ঘটনা*
মদিনায় এসে তিনি সরাসরি রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করেন। একবার অনিচ্ছাকৃতভাবে তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর জন্য রাখা দুধ পান করে ফেলেন এবং গভীর অনুশোচনায় ভোগেন। কিন্তু নবী ﷺ কোনো রকম তিরস্কার না করে দুআ করেন—
“হে আল্লাহ! যে আমাকে খাওয়ায়, আপনি তাকে খাওয়ান; যে আমার তৃষ্ণা নিবারণ করে, আপনি তাকে তৃপ্ত করুন।”
এরপর মিকদাদ (রা.) যখন নবী ﷺ–এর জন্য দুধ সংগ্রহ করতে যান, তখন তিনি এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হন—পূর্বে দোহন করা বকরির ওলান পুনরায় দুধে ভরে ওঠে। এটি ছিল তাঁর ঈমানের জন্য আল্লাহর এক বিশেষ সম্মান ও সান্ত্বনা।
*বদরের প্রান্তরে ঐতিহাসিক ভূমিকা*
বদরের যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। যুদ্ধের আগে রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের মতামত চাইলে, মিকদাদ (রা.) উঠে দাঁড়িয়ে যে ভাষণ দেন—তা আজও ঈমানদারদের হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন:
“হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ আপনাকে যা আদেশ দিয়েছেন, আপনি তা বাস্তবায়ন করুন—আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আল্লাহর কসম! আমরা বনী ইসরাঈলদের মতো বলব না—‘আপনি ও আপনার রব গিয়ে যুদ্ধ করুন, আমরা এখানে বসে থাকব।’ বরং আমরা বলি—আপনি ও আপনার রব যুদ্ধ করুন, আমরাও আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব।”
এই দৃপ্ত উচ্চারণে রাসুলুল্লাহ ﷺ আনন্দে উদ্ভাসিত হন এবং সাহাবীদের হৃদয়ে সাহসের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে।
*চরিত্র, মর্যাদা ও গুণাবলি*: মিকদাদ (রা.) ছিলেন শুধু সাহসী যোদ্ধা নন, বরং উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন একজন আলেম ও কুরআনের শিক্ষক। শামে তাঁর কুরআন তিলাওয়াত ও শিক্ষা ছিল বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে বলেন—
“আল্লাহ আমাকে চারজনকে ভালোবাসার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমাকে জানিয়েছেন যে তিনিও তাঁদের ভালোবাসেন—আলী, মিকদাদ, আবু যার ও সালমান।”
এটি তাঁর আত্মিক মর্যাদা ও আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্যতার এক অনন্য স্বীকৃতি।
*ইন্তিকাল* : দীর্ঘ বরকতময় জীবন শেষে প্রায় ৯০ বছর বয়সে হযরত মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাযি.) সিরিয়ার দামেস্কে ইন্তিকাল করেন। আজও তাঁর কবর দামেস্কের উপকণ্ঠে জয়নাবিয়া রোডের পাশে অবস্থিত—ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে।
হযরত মিকদাদ (রাযি:)–এর আনুগত্য ছিল অটল নোঙরের মতো—ঝড় যত প্রবলই হোক, তাঁর ঈমানের জাহাজ কখনো দিকভ্রষ্ট হয়নি।তিনি আমাদের শেখান—সত্যের পথে একবার দাঁড়িয়ে গেলে, পিছনে তাকানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ আমাদেরকে সাহাবীদের মতো নিখাদ ঈমান, নিঃশর্ত আনুগত্য ও অকুতোভয় সাহস দান করুন। আমিন।