নির্বাচনী ইশতেহারে ১৫ সংস্কার অঙ্গীকার চায় সুজন

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে দেখতে চায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংগঠনটির মতে, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে বিচার, সংস্কার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন ইশতেহারে না থাকলে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ১৫টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব ও প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপে এসব দাবি তুলে ধরেন সুজনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার। সংলাপে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অংশ নেন।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং নির্বাচনী ব্যবস্থার অবক্ষয়ের সুযোগ নিয়ে গত দেড় দশকে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই ধারার বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন সূচনা।

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে তিনটি বিষয় অগ্রাধিকার পায়—বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে।

সুজন জানায়, এসব কমিশনের সুপারিশের আলোকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। সংগঠনটির মতে, এই সনদ জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলন, ত্যাগ ও বঞ্চনার ফলাফল হিসেবে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক চুক্তি। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট, সময়বদ্ধ ও দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার থাকতে হবে।

সংলাপে উত্থাপিত ১৫ দফার মধ্যে প্রথমেই গুরুত্ব দেওয়া হয় জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং সংবিধানে তা তফসিল হিসেবে বা উপযুক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতির ওপর। পাশাপাশি সনদের বৈধতা নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো আইনি প্রশ্ন না তোলা এবং এর বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও ১৫ দফার অন্যতম প্রধান দাবি। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের সংস্কৃতি যাতে আর ফিরে না আসে, সে জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে মানবাধিকারসম্মত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার সুস্পষ্ট রূপরেখা ইশতেহারে থাকতে হবে।

এ ছাড়া বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয় সুজন। নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। এ ক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনের বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়।

ক্ষমতার ভারসাম্য প্রসঙ্গে সংলাপে বলা হয়, নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স প্রতিষ্ঠা ছাড়া গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব নয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমারেখা স্পষ্ট করা, সংসদের নজরদারি জোরদার করা এবং সংবিধানের সমান প্রয়োগের অঙ্গীকার ইশতেহারে থাকা প্রয়োজন।

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও সুজন একাধিক সুপারিশ তুলে ধরে। সংরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে তা পূরণ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কৌশল ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়।

এ ছাড়া শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ক্ষমতা ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ, নিয়মিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং আনোয়ার হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলার রায় অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়।

স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, বিশুদ্ধ বায়ু ও নিরাপদ পানীয় জলের সংকট সমাধানে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ঘোষণার দাবিও তোলে সুজন। পাশাপাশি পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভারসাম্যপূর্ণ, আত্মমর্যাদাশীল ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গীকার ইশতেহারে দেখতে চায় সংগঠনটি।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গত কয়েক দশকে রাজনীতির যে অবক্ষয় ঘটেছে, তা পরিবর্তন না হলে গণতন্ত্র টেকসই হবে না। রাজনীতিকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করার সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে সহিংসতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, মানুষ এখন আর কেবল প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা জানতে চায়—কে কী সংস্কার করবে, কীভাবে করবে এবং কত সময়ের মধ্যে করবে। নির্বাচনী ইশতেহারই প্রমাণ করবে কোন দল গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রস্তুত।

আরো