২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১,০০৮ শিশু
২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় এক মাস থেকে ১৭ বছর বয়সী মোট ১ হাজার ৮ জন শিশু নিহত হয়েছে। সড়ক ও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে শৈথিল্য এবং সচেতনতার অভাবের কারণেই শিশুমৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবেদনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যসূত্র বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত শিশুদের মধ্যে ৫৩৭ জন বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী, চালক বা হেলপার হিসেবে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। অপরদিকে, পথচারী অবস্থায় যানবাহনের ধাক্কা বা চাপায় নিহত হয়েছে ৪৭১ শিশু।
সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মহাসড়কে ২৮১ জন, আঞ্চলিক সড়কে ৩৬৪ জন, গ্রামীণ সড়কে ২৯১ জন এবং শহরের সড়কে ৭২ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী নিহত শিশুর সংখ্যা ১৭৯ জন। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ৩৮২ জন এবং ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৪৪৭ জন শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে।
প্রতিবেদনে শিশু মৃত্যুর পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সড়ক ও যানবাহন ব্যবস্থা শিশুদের জন্য নিরাপদ না হওয়া, সড়ক ব্যবহারে শিশুদের অজ্ঞতা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ সড়ক ব্যবহার বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার অভাব, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা সুবিধার সংকট।
এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সুপারিশ করেছে, শিশুদের নিরাপত্তা বিবেচনায় সড়ক ও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুদের নিরাপদ সড়ক ব্যবহারে সচেতন করতে হবে। অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সময় এবং বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলাধুলার সময় শিশুদের দুর্ঘটনায় পড়ার ঘটনা বেশি ঘটছে। বিশেষ করে গ্রামীণ সড়কগুলোতে পথচারী হিসেবে শিশুরা সবচেয়ে বেশি হতাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় ঘরের দরজা খুললেই সড়ক—এমন বাস্তবতায় শিশুদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
এসব সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি কম থাকায় চালকেরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অন্যদিকে শিশুরাও সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে সচেতন নয়। এই অব্যবস্থাপনাই শিশুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, শিশু মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কারণ প্রতিটি শিশুই সম্ভাবনাময়, আর আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ।