দেশপ্রেম, জনআস্থা ও জবাবদিহির বাংলাদেশ

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

দেশকে ভালোবাসে সবাই—এ কথা বলা সহজ। কিন্তু নিঃস্বার্থভাবে দেশকে ভালোবাসে, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষের কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়—এমন মানুষের সংখ্যা কত? রাষ্ট্র ও রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। দেশপ্রেম শুধু স্লোগানে নয়; দেশপ্রেমের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় দায়িত্বশীলতা, সততা, ন্যায়বোধ এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে। জনগণ কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন প্রত্যাশা করে না; তারা চায় রাষ্ট্রের চরিত্রের পরিবর্তন। তারা চায় এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের ঢাল হবে না, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা অন্যায়ের লাইসেন্স হবে না এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য প্রভাবশালী কারও দ্বারস্থ হতে বাধ্য হবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির প্রতি মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। দলের সমর্থকদের দৃষ্টিতে এই আস্থা বিশেষভাবে দুই দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা ও ত্যাগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। একই সঙ্গে বর্তমান নেতৃত্বের কাছেও মানুষের প্রত্যাশা—এই আস্থা যেন কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, সততা, সুশাসন, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের বাস্তব কর্মসূচির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হয়।
চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি হলো চাঁদাবাজি, দখলদারি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। কোনো রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, দখল বা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ একটি দলের হাজারো ত্যাগী ও সৎ কর্মীর অর্জন কয়েকজন অপরাধীর কর্মকাণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো—অপরাধীকে আশ্রয় না দেওয়া এবং দলের নাম ব্যবহার করে অপরাধ করার সুযোগ বন্ধ করা। আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখানেই: অপরাধী কে—তা নয়; অপরাধ কী হয়েছে—সেটিই হতে হবে বিচারের প্রধান বিবেচনা।
১/১১-এর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১/১১ একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক অধ্যায়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং পরদিন সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পেছনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, নির্বাচন নিয়ে গভীর বিরোধ ও সহিংস পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ইতিহাসের শিক্ষা হলো—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের আস্থা হারালে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলে অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ঝুঁকি বাড়ে। ২০০৭–০৮-এর অভিজ্ঞতায় দেখেছি- শুধু দুর্নীতিবিরোধী অভিযান বা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই স্থায়ী সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না; রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করাও অপরিহার্য। তাই বলবো- কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির অপেক্ষা না করে এখনই রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের কল্যাণে সক্রিয় রাখার সরকারকেই করতে হবে।
স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবে জিরো টলারেন্স যেন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; এর বাস্তব প্রয়োগ হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আইনসম্মতভাবে। সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী কিংবা ব্যবসায়ী—অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই উঠুক, তদন্ত হতে হবে একই মানদণ্ডে। প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের অপব্যবহারও বন্ধ করতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি তদন্তে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বহুলাংশে হ্রাস পাবে: সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি তদন্তের জন্য আরও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন। প্রয়োজনে স্বাধীন ও দক্ষ তদন্তব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে অভিযোগের দ্রুত যাচাই, সম্পদের অসঙ্গতি নিরূপণ এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়। তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, পেশাগত দক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্নীতি দমন করতে গিয়ে যদি তদন্ত প্রতিষ্ঠানই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ: দেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিগত কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক, আমলা ও সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী, ব্যবসায়ীসহ সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষ রাজনৈতিক সুবিধায় বিপুল অর্থ দেশ থেকে পাচার করেছে। অর্থ পাচারকারীদের তালিকা করে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে কঠোর সাজার ব্যবস্থা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সামঞ্জস্য করে প্রয়োজনে আইন সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক আইনি সহায়তা, আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনগত প্রক্রিয়া ব্যবহার করতে হবে। বিশেষায়িত আদালত বা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অর্থপাচার সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে—তবে সেই ব্যবস্থার ভিত্তি হতে হবে সংবিধান, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির যথাযথ আইনি অধিকার। একইভাবে, দেশে থাকা অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ চিহ্নিত করে আদালতের আদেশ ও প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বিচারে সম্পদ জব্দ নয়; তদন্ত, প্রমাণ এবং আইনসম্মত সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি।
সৎ ও দেশপ্রেমিক মানুষের ওপর আস্থা বাড়াতে হবে: রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যোগ্যতার সঙ্গে সততা ও দেশপ্রেমের সমন্বয় না ঘটলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন। তাই রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন মানুষকে সামনে আনতে হবে, যাদের ব্যক্তিগত সততা, পেশাগত দক্ষতা এবং জনকল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে মানুষের আস্থা রয়েছে। রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণের বিশ্বাস। এই বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। তাই ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং দলীয় আনুগত্যের চেয়ে ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের মানুষ একটি সাম্য, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্র চায়। সেই রাষ্ট্র নির্মাণের পথে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, দখলদার ও অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের আত্মশুদ্ধি। আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহি, রাজনীতির সঙ্গে নৈতিকতা এবং উন্নয়নের সঙ্গে ন্যায়বিচারের সমন্বয়। দেশপ্রেমের পরীক্ষা কথায় নয়, কাজে। আর জনগণের ভালোবাসার প্রকৃত প্রতিদান ক্ষমতা ভোগে নয়—একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায়।
ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী বাংলাদেশ: বিভেদ নয়, জাতীয় ঐক্যই এখন সময়ের দাবি
একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের অবসানের পর রাষ্ট্র যখন নতুন পথে যাত্রা শুরু করে, তখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়—অতীতের বিভেদকে পেছনে ফেলে ভবিষ্যতের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাকেও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন।
ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন ছিল অনেকের দৃষ্টিতে সময়ের ব্যাপার মাত্র। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান, সংগঠন, জনসমর্থন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে বিএনপিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনই যে জনগণের আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে পারে—এমনটি ধরে নেওয়া যায় না। পরিবর্তনের প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করে রাষ্ট্রব্যবস্থায় কতটা গুণগত পরিবর্তন আসে তার ওপর।
পরিবর্তনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষা : সরকার পরিবর্তন একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করে না। প্রশাসন, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো টেকসই না হলে পুরোনো সমস্যাগুলো নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে।এই কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য অংশের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত গ্রহণের জন্য গণভোটের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত বা জনঅভিপ্রায় প্রকাশিত হয়েছে, তার সাংবিধানিক ও আইনগত বাস্তবায়নও রাষ্ট্রীয় বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন মতপার্থক্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে অচলাবস্থা, সংঘাত বা প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার দিকে নিয়ে যায়।
জনগণের অভিপ্রায়ের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা: কোনো গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো জনগণের ইচ্ছা। নির্বাচন, গণভোট কিংবা অন্য কোনো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় জনগণ যে সিদ্ধান্ত দেয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো তার মর্যাদা রক্ষা করা। জনগণের অভিপ্রায়কে কেবল নির্বাচনের দিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখলে গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। নির্বাচনের পরও সরকার ও রাজনৈতিক দলকে জনগণের প্রত্যাশা, অধিকার এবং জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে থাকতে হয়। এই জায়গাতেই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় থাকার রাজনীতির বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রকে কীভাবে প্রতিষ্ঠাননির্ভর করা যায়।
বিএনপির সামনে বিশেষ দায়িত্ব: বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ ও জনগণের বড় অংশের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করায় দায়িত্বও স্বাভাবিকভাবেই বেশি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসা কোনো দলের সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি শুধু কত আসন বা কত ভোট পাওয়া নয়; বরং ক্ষমতায় গিয়ে সে কতটা সুশাসন, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি কিংবা দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা এই আস্থার অন্যতম পরীক্ষা। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তাকে রক্ষা না করে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মনে রাখতে হবে-জনগণ সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও প্রত্যাশা করে। যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফ্যাসিস্ট তৈরীর ক্ষেত্র তৈরী করে সেটা বর্জণ করতে হবে। রাজনৈতিক বিভেদ কোনো দেশের জন্য স্থায়ী নিয়তি নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সংকটময় সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেছে। বাংলাদেশও সেই ধরনের একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দখলদারি, দুর্নীতি ও পারস্পরিক অবিশ্বাসে নষ্ট হয়, তাহলে পরিবর্তনের প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। আর যদি রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের অভিপ্রায়কে সম্মান করে, প্রয়োজনীয় সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এবং জাতীয় স্বার্থে ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে পরিবর্তন একটি টেকসই রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। সেই শুভদিনের প্রত্যাশায় রইলাম।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজকর্মী।

আরো