এক আজব রাজনৈতিক দল জামাত
ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন এমবিই
জামাত এক বৈচিত্রময় চরিত্রের অধিকারী। বহুমুখী ষড়যন্ত্রের বহু দরজার এক আজব রাজনৈতিক দল। তারা আন্ডারগ্রাউন্ডের রাজনীতি খুব ভালো বোঝে। ২০০১ সালে বিএনপির সাথে সরকার গঠন করে ২ জন মন্ত্রী পেয়ে ক্ষমতার লোভে পেয়ে বসেছে। ১/১১ পুরো ষড়যন্ত্র ‘র’-এর (RAW) সাথে হাত মিলিয়ে সফল হয়েছে। তখন তারা বলছে বিএনপি দুর্নীতিবাজ আর তাদের দুইজন মন্ত্রী কোনো অন্যায় বা দুর্নীতি করেনি। কিন্তু তারা করেছে ব্যাপক স্বজনপ্রীতি এবং দলকানা। ভেতরে ভেতরে তারা দলের জন্য ব্যাপক কাজ করেছে। কিন্তু বিএনপি বুঝতে পারেনি, তারা সফল। বেগম খালেদা জিয়ার সরলতার সুযোগ নিয়ে তারা বিএনপির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়াকে জোর করে নির্বাচনে নিয়ে হাসিনাকে ক্ষমতায় আনে। ফ্যাসিবাদ-এর পথকে সুগম করে। তার ফলাফল এক বর্ণাঢ্য ইতিহাস। তারা (জামাত) চারদলীয় জোটের অংশ হিসেবে ২০০১ সাল থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে খুব রাজনৈতিক তৎপর ছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তাদের, অর্থাৎ বিরোধী জোটের ওপর, প্রচুর দমন-পীড়ন ও নির্যাতন করে, যা ছিল অপ্রত্যাশিত। এই অবস্থা দেখে জামাত না পেরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর (RAW) মধ্যস্থতায় গোপনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আবার আঁতাত করে। কিন্তু বিএনপির নেতাদের তা বুঝতে দেরি হয়। তখনো বিএনপি জামাতের প্রতি দুর্বল মনোভাব নিয়ে চারদলীয় জোটে অটুট বন্ধন প্রকাশ করে। জামাত আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সন্ধিতে লিপ্ত হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের ভারতীয় ‘র’-এর মিশন থেকে সরে আসেনি।
এরপর শুরু হয় জামাতের প্রভাবশালী নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার। গড়ে ওঠে বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল। একে একে বাঘা বাঘা সব নেতার ফাঁসির আদেশ হয় এবং কার্যকর করা হয় ফাঁসি।কিন্তু আধুনিক জামাত তখন প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বলতে থাকে, তাদের ফাঁসি দিলে বা বিচার কার্যকর হলে জামাতকে আর কেউ যুদ্ধাপরাধীর তকমা দিতে পারবে না। “ফাঁসি হলে ফাঁসি হয়ে যাক”—এমন দাবি করে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্ম ও যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত নয় জামাত বা জামাতের নতুন প্রজন্ম। সেই প্রেক্ষাপটে জামাত ভেঙে গঠিত হয় এবি (আমার বাংলাদেশ) পার্টি। তারা তাদের প্রবীণ নেতাদের জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। প্রবীণ নেতারা জেলখানায় বসে ফাঁসির আগে-পরে অনেক আক্ষেপ করে এই সেই জামাতের ওপর। জামাত কত স্বার্থপর ও স্বার্থান্বেষী। বিগত দিনে, ১৯৮৬ সালেও এরশাদের সঙ্গে জামাতের সখ্যতা ছিল। ১৯৮৬ সালে সিদ্ধান্ত হয় সকল দল নির্বাচন বর্জন করবে। সেদিন শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “যারা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাবে, তারা হবে জাতীয় বেইমান।” কিন্তু জামাত ও আওয়ামী লীগ আবারও ‘র’-এর প্ররোচনায় ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জাতীয় বেইমান হিসেবে আখ্যায়িত হয়। আর এখন সেই জামাত বলে, জাতীয় পার্টি ফ্যাসিবাদের দোসর। তাদের নিষিদ্ধ করতে হবে। তারা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ১৯৯১ সালে মৌখিক জোটে আসে এবং ১৮টি আসন পায়।পরে ক্ষমতার গন্ধ পেয়ে বসে। আবার ‘র’-এর (RAW) খপ্পরে পড়ে ১৯৯৬ সালে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করে। জেনারেল নাসিমের ষড়যন্ত্রে ১৯৯৬ সালে হাসিনা ক্ষমতায় আসে। তারপর আবার ১৯৯৬ সালে শিক্ষা নিয়ে বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন করে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসে।
আবার তারা সুযোগ খুঁজতে থাকে। এলো ১/১১। এই সময় তাদের গ্রেফতার বা অন্য কোনো আঁচড় লাগেনি। তারা সদর্পে দাবিয়ে বেরিয়েছে পুরো দেশ। কিন্তু এখানে বড় ক্ষতি হয়েছে বিনপির, যা পুশিয়ে নেয়ার মত নয়। তারপরও বিনপি জামায়াতকে অনেক ছাড় দিয়েছে। আর ১/১১-এর কুশীলবদের সাথে সখ্যতা ছিল অনেক গভীর। তারপর শুরু হলো ফ্যাসিবাদের ১৭ বছরের ইতিহাস। সুখে-দুঃখে তারা (জামাত) বিএনপির সাথে ছিল এবং বিএনপিও তাদের আগলে রেখেছিল। কিন্তু ফ্যাসিবাদের বহু প্রতীক্ষিত পতনের পর তারা আবার ফিরে এলো তাদের আসল রূপে। এখন তাদের অলীক স্বপ্ন ক্ষমতা। সব বাদ দিয়ে ক্ষমতা তাদের চাই।
এখন তারা আবার নিয়ে এলো ধার করা পিআর (PR)। আসলে তাদের সঠিক কোনো আসন নেই। কয় আসনে জিতবে, কয়টা আসন পাবে—তারা সঠিক কোনো হিসাব মেলাতে পারে না। কারণ স্বাধীনতার পর তারা এককভাবে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তাই তাদের কাছে সঠিক কোনো পরিসংখ্যানও নেই, তারা কয়টি আসন পাবে।
কিন্তু তাদের (জামাতের) প্রতি আসনে ছড়ানো-ছিটানো অনেক ভোট আছে। তবে এককভাবে কোনো আসন পাওয়ার মতো পরিসংখ্যান তাদের নেই। নির্দিষ্ট কোনো আসন না থাকায় তারা পিআর-এর (PR) জন্য মরিয়া।
এই ধার করা পিআর একদিন জামাতের জন্য বুমেরাং হবে, এটা জামাত নিজেও বোঝে। তাই বর্তমান দুর্বল অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য এবং অসাংবিধানিক সরকারকে ক্ষমতায় আনার জন্য এসব ফাজলামো শুরু করেছে। কারণ এই অসাংবিধানিক সরকার দীর্ঘায়িত হলে জামাতের জন্য ভালো। কারণ তারা অতীতেও এসব কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পর জামাত রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে বিভিন্নভাবে জামাতই একমাত্র সংগঠন, যারা প্রত্যক্ষভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচন না করে বিভিন্নভাবে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করে। তাই তারা বহুমুখী ষড়যন্ত্র করে। নীল নকশার নির্বাচন, প্রহসন ও অবৈধ ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে মরিয়া।
আমরা যদি পিআর (PR) পদ্ধতির জন্য নেপালের দিকে তাকাই, এই পদ্ধতির কারণে নেপালে আজ গৃহযুদ্ধ। কারণ পিআর পদ্ধতিতে সবাই সমান সুযোগ চায়। কিন্তু কেউ কম বা বেশি হলে স্বজনপ্রীতির আড়ালে অনেক অকথ্য সমস্যার উদ্ভব হয় এবং একটি স্বাধীন দেশ ধাউ ধাউ করে জ্বলে পিআরের আগুনে। তাই আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের ছোট দেশগুলোতে পিআর কোনোভাবেই মানানসই বা উপযোগী হতে পারে না। কারণ আমরা এখনো গণতন্ত্রকে ভালোভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। কীভাবে আমরা পিআরকে আলিঙ্গন করব আর জামাতকে এই পিআরের কুফল ভোগ করতে দেব?
পিআর (PR) পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ, শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত—কেউই জানে না এই পদ্ধতি কী এবং এর সুফল-কুফলই বা কী।