দূষিত শহরের তালিকার শীর্ষে ঢাকা টনক নড়বে কবে?

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় বিগত বছরের ন্যায় এবছরও শীর্ষস্থান দখল করেছে বিশ্বের সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ মহানগর ঢাকা। বিশ্বের ১২৬টি শহরের মধ্যে ২৫৬ স্কোর নিয়ে শীর্ষে থাকা ঢাকার বায়ু ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ । অথচ আমাদের পরিবেশ মন্ত্রণালয় বায়ুদূষণ প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়েছে। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা AIR QUALITY INDEX (IQAIR) সূচক থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, একই সময়ে ১৯২ স্কোর নিয়ে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের কলকাতা শহর। এছাড়া ১৯০ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চীনের উহান শহর এবং ১৮২ স্কোর নিয়ে যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে রাশিয়ার ক্রাসনোয়ারস্ক শহর ও ভারতের দিল্লি শহর।

একিউআই স্কোর শূন্য থেকে ৫০ ভালো হিসেবে বিবেচিত হয়। ৫১ থেকে ১০০ মাঝারি হিসেবে গণ্য করা হয়, আর সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর বিবেচিত হয় ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর। স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে তাকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু বলে মনে করা হয়।

লেখক: মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকা একিউআই স্কোরকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। এ অবস্থায় শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ রোগীদের বাড়ির ভেতরে এবং অন্যদের বাড়ির বাইরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। এ ছাড়া ৩০১ থেকে ৪০০-এর মধ্যে থাকা একিউআই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে বিবেচিত হয়, যা নগরের বাসিন্দাদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
*বায়ু দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব:* বায়ু দূষণেরফলে মানব স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে, যার মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের রোগ (হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস), হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার, মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যা, ত্বকের রোগ, প্রজনন স্বাস্থ্যহানি এবং অকাল মৃত্যু অন্যতম; এছাড়াও, এটি অম্লবৃষ্টি, ধোঁয়াশা ও জলবায়ু পরিবর্তন ঘটায় এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনকেও বিপন্ন করে তোলে।
*মানবিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব:* শ্বাসতন্ত্র: হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, COPD, ফুসফুসের সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং ফুসফুসের ক্যান্সার।

*হৃদরোগ* : স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, রক্তচাপ বৃদ্ধি এবং কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা।
*স্নায়ুতন্ত্র:* স্মৃতিশক্তি হ্রাস, জ্ঞানীয় দুর্বলতা (cognitive decline), ডিমেনশিয়া এবং নিউরোলজিক্যাল ব্যাধি।
এছাড়া বায়ুদূষণের প্রভাবে রক্তাল্পতা, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা, প্রজনন সমস্যা, ত্বকের রোগ, ডায়াবেটিস এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে থাকে।
মৃত্যু: এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে ১৩ কোটি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। আবহাওয়ার ধরনের কারণে স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ ও ফুসফুসের রোগের সঙ্গে ক্যানসারজনিত মৃত্যু ১৪ শতাংশ বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার তাদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বব্যাপী শুধু ২০২১ সালেই ৮০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। আর বাংলাদেশে এই মৃত্যুর সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার। অথচ করোনার মতো অতিমারিতেও বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ২৯ হাজার ৪৯৯।বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ২০ শতাংশের জন্য বায়ু দূষণ দায়ী। ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় এই মৃত্যু ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অথচ বায়ু দূষণ প্রতিরোধে নেই কোন কার্য
করী উদ্যোগ।
*পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর প্রভাব:*
*জলবায়ু পরিবর্তন* : গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি।
*অম্লবৃষ্টি* : সালফার ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড থেকে অম্লবৃষ্টি, যা মাটি ও জলকে দূষিত করে।
*ধোঁয়াশা* : যানবাহনের ধোঁয়া ও সূর্যালোকের বিক্রিয়ায় আলোক রাসায়নিক ধোঁয়াশা তৈরি।
*উদ্ভিদ ও প্রাণী* : উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত করা, প্রাণীদের শ্বাসকষ্ট ও রোগ সৃষ্টি।
সংক্ষেপে বলা যায়-বায়ু দূষণ শুধু শ্বাসকষ্টের কারণ নয়, এটি মানব দেহের প্রায় প্রতিটি অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং পৃথিবীর ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট করে। ঢাকার বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশের জন্য দায়ী শহরের আশপাশের ইটভাটাগুলো। পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানালেও বহু ইটাভাটা অনুমোদনবিহীনভাবে চলছে। তা ছাড়া পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার নিয়ে নানা আলাপ-আলোচনা হলেও এর প্রচলন নেই বললেই চলে। অথচ সরকার চাইলে সরকারি প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে পারে। দেশে নির্মাণকাজের বেশির ভাগই সরকারি প্রকল্প। নির্মাণকাজে বায়ুদূষণের সরকারি হিস্যাও তাই বেশি। পরিবেশবান্ধব ইট যদি সরকারি প্রকল্পে ব্যবহার শুরু হতো, তাহলে বেসরকারিভাবেও এর প্রচলন বাড়ত। অন্যদিকে ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া শহরে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানে আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখছি না। শহর এলাকার বায়ুদূষণ রোধে মেক্সিকো আর চীনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে যানবাহনের লাইসেন্সের নম্বর অনুযায়ী এক দিন পরপর এগুলোকে রাস্তায় নামার অনুমতি দিয়ে বায়ুদূষণ কমানো হয়। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু মানুষের জীবনের চেয়ে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। সরকারের কার্যকরী আশু পদক্ষেপ ও সামাজিক আন্দোলন জরুরী।

আরো