শহীদ জিয়ার সার্বজনীন দর্শন: গণঐক্য, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার গ্যারিন্টি
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
সিপাহী- জনতার বিপ্লবের মহানায়ক, সফল রাষ্ট্রনায়ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, দূরদর্শী সমাজচিন্তক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। শাহাদাতের প্রায় চার দশক পরেও সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও সুশাসনের প্রতীক হিসাবে তিনি সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। উপমহাদেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক যিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে রক্ষী বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক দমননীতি এবং মুজিব বাহিনী, ও তাএকদলীয় দুঃশাসন ও বিভাজন থেকে জাতিকে মুক্ত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অথচ সর্বজয়ী ভূমিকাকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও আদর্শ হিসাবে ধারণ তাঁর জীবন ও অবদান খণ্ডিতভাবে তুলে ধরারই নামান্তর। ৭ই নভেম্বরের সিপাহী জনতার বিপ্লব পরবর্তী সময়ে পাদ প্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত শহীদ জিয়ার অন্যতম অবদান ছিল সংবিধানের ৫ম সংশোধনী-যার মাধ্যমে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে রাষ্ট্রে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পথ পরিক্রমায় সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ও মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস এবং বিপ্লবকে অর্থবহ ও জন সংহতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ সংযোজন করেছিলেন। আধিপত্যবাদী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের নানা ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও স্বল্প পরিসর রাজনৈতিক জীবনে রাজনীতিতে কল্যাণমুখী ধারার প্রবর্তন ও গণমানুষের আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়ে সর্বমহলে প্রশংসিত ও জনগণের অন্তরে স্থায়ী আসন গড়ে তুলেছিলেন । বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিবর্তন, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি লক্ষ্যে এবং রাষ্ট্রের কল্যাণে গৃহিত বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করছিলেন। অথচ পঁচাত্তyরের পরাজিত শক্তি ও তাদের দোসর অপশক্তি তাঁর ঈর্ষণীয় সাফল্য মেনে না নিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল এবং আধিপত্যবাদী ও সম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে যোগসাজশে এই মহান দেশপ্রেমিক নেতাকে হত্যা করে বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূণ্য করা হয়েছিল। কুচক্রী ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভারত থেকে দেশে ফেরার মাত্র ১৩ দিন পর জিয়া হত্যা সংঘটিত হয়েছিল এবং সাক্ষাৎকারে বলেছিল-‘আই এম নট আনহ্যাপী’। দলের আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব মেটাতে তিনি চট্টগ্রামে গিয়ে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হলেন। শহীদ জিয়ার গতিশীল নেতৃত্বের সেই শূণ্যতা আজো পূরণ হয়নি-গণতন্ত্র, সুশাসন ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায় ও বৈষম্য নিরসনে ছাত্র-জনতাকে এখনো রাজপথে অকাতরে রক্ত দিতে হয়। ৭ই নভেম্বরের বিপ্লব ব্যর্থ হবার মাশুল আজও জাতি বহন করে চলেছে। সাম্প্রতিক জুলাই-২০২৪ বিপ্লব ব্যর্থ হলে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকীর মুখে পড়তে পারে।
সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা এই মহান নেতা দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের আপামর মানুষের কাছে মহান জাতীয় বীর হিসাবে স্বীকৃত। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আত্মনির্ভরতা, গণতন্ত্র, ধর্মীয় সহনশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে একটি উন্নত জাতি গড়ে তোলা। ভারতের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মুসলিম বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন, উপসাগরীয় যুদ্ধের অবসান ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ফারাক্কা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক আদালতে উত্থাপনসহ দেশ-বিদেশে নানা অসম সাহসী ভূমিকা পালনকারী ও বিরল কৃতিত্বের অধিকারী একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক। স্বল্প সময়ের শাসনকালে তিনি সকল শ্রেণি-পেশা-বর্ণ-ধর্মের মানুষের জন্যই এক অনন্য অনুপ্রেরণা—তাঁর দর্শন সার্বজনীনতা ও আদর্শ জাতীয় কল্যাণে নিবেদিত ছিল। দেশ-জাতি-মেহনতি মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এসব পদক্ষেপ কোন দল বা ব্যক্তি বিশেষের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে ছিলনা। এদেশের ইসলাম প্রিয় মানুষের কল্যাণে আশা জাগানিয়া ব্যক্তিত্বরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। মাত্র ৫বছর ৬ মাস ৩দিনের শাসনকালে গণমানুষের আকাঙ্খাকে পুরোপুরি ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন- তাই তিনি আজও এতো জনপ্রিয়, দুর্যোগে ও সঙ্কটে তিনি আমাদের পথ দেখান। জাতীয় রাজনীতির চরম বিভাজিত পরিস্থিতিতে তার নির্মোহ ও নির্লোভ জীবনের সার্বজনীনতা জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

শেখ মুজিবের শাসনকালে কিংবা শেখ মুজিবের নির্মম পরিণতির পর হতে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোন প্রকার রাজনৈতিক আলোচনায় ছিলেননা। শেখ মুজিবের হত্যাকান্ডের সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ্। উপ সেনা প্রধান হিসাবে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তার পদে অধিষ্ঠিত থাকার পরেও কোন প্রকার রাজনৈতিক অভিলাষ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় আত্মনিয়োগ ও সৈনিক জীবনকে তিনি ভালভাবেই উপভোগ করছিলেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে দেশপ্রেমিক অকুতোভয় সৈনিক হিসাবে তিনি শৃঙ্খলা রক্ষা ও আনুগত্যের মূর্ত প্রতীক ছিলেন। তবে রাষ্ট্র ও জনগণের চরম বিপরীতে অবস্থান নেয়া তৎকালীন শেখ মুজিব সরকারের ভারতীয় তাবেদারী-গোলামী চুক্তি, দুঃশাসন ও সরকারের নানা গণবিরোধী অপকর্মে তিনি নির্লিপ্ত ছিলেন সেটাও নয়-মাতৃভূমির ডাক, সময় ও সূযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। শেখ মুজিবের উৎখাত, খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ নেতাদের নতুন সরকার গঠণ ও খালেদ মোশাররফের ক্যু পরবর্তী সময়ে তিনি পাদ প্রদীপের আলোয় আসলেন এবং গণমানুষের মন জয় করে মণিকোঠায় স্থান লাভ করলেন।
শেখ মুজিবের শাসনকালে (১৯৭২-১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ খ্রী:) সর্বক্ষেত্রে সীমাহীন বৈষম্য, স্বজনপ্রীতি, আত্মীকরণ, দূর্নীতি ও দুঃশাসন, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবাধ লুণ্ঠন, জাতীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতীক সেনাবাহিনীর প্যারালাল রক্ষী বাহিনী ও লাল বাহিনী গঠণ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর রক্ষী বাহিনীর চরম নির্যাতন, ইসলাম প্রিয় আলেম-উলামাদের প্রতি চরম বিদ্বেষী আচরণ ও ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ, ভারতের সাথে অসম চুক্তি, দূর্নীতি-স্বজনপ্রীতি ও পার্শ্ববর্তী দেশে চোরাচালানী-খাদ্য শস্যের সুষম বন্টনের ব্যর্থতায় দুর্ভিক্ষের ফলে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ইত্যাদি কারণে দেশব্যাপী জনমনে চরম অসন্তোষ বিরাজমান ছিল। এছাড়া রক্ষীবাহিনীর সাথে সেনাবাহনিীর দ্বন্দের চরমতম অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির আদেশে মেজর ডালিম এবং মেজর নূরকে অবসর দেয়ায় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চরম উত্তেজনা চলছিল। এছাড়া ১৯৭২-এর সংবিধান তিনবার সংশোধনের পর চতুর্থবারে এসে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারী একদলীয় ‘বাকশালী’ শাসনের সংবিধানে রূপান্তর, বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের কারণে শাসক হিসাবে শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তলানীতে নেমে আসায় ক্ষমতার পট পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। আগস্ট অভ্যুত্থানের ফলে একদলীয় বাকশাল শাসনের দুঃসহ অবস্থা থেকে জাতি মুক্তি লাভ করেছিল, সংবাদপত্রগুলো স্বাধীনতার মুখ দেখতে পেয়েছিল। গ্রামে গ্রামে রক্ষীবাহিনীর ঘেরাও ও দমনের অভিযান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকদিন পর গ্রামের মানুষ শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগ পেয়েছিল। এ প্রাপ্তিগুলো কোনোক্রমেই ঠুনকো কিছু ছিলনা। একটি দেশের সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্নতা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারলে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! তাই বলা যায়, ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের মানুষ সুখ কিসে, তা বুঝতে শুরু করেছিল।
মহান আগস্ট বিপ্লবের দাবীদার সেনা কর্মাকর্তাদের সবাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, বিপ্লবের বেনিফিশিয়ারী হিসাবে আওয়ামীলীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাই ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন। অধ্যাপক আহমদ শরীফের ভাষায়- ‘শেখ মুজিবকে যারা হত্যা করল, তারা গোড়ায় সবাই মুজিবের অনুগত ছিল’ … শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসন কিন্তু হত্যা-লুণ্ঠনের বিভীষিকা, যা মুজিবকে গণশত্রুতে পরিণত করেছিল’ (সূত্র: আহমদ শরীফের ডায়েরি: ভাব-বুদ্বুদ)। ’৭৫-এর পটপরিবর্তন ও শেখ মুজিবের নির্মম মৃত্যুর পর আওয়ামীলীগের শীর্ষনেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতায় আসীন হন এবং বিদায়ী বাকশাল সরকারের নীতি নির্ধারকদের সমন্বয়ে মন্ত্রী পরিষদ গঠণ করেন। খন্দকার মোশতাক ছিলেন বাকশালের কার্যকরী কমিটির সদস্য. আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম মহাসচিব, মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারে তিনি পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারে তিনি বিদ্যুৎ, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী ও শেখ মুজিব হত্যাকান্ডের পূর্ব পর্যন্ত বাণিজ্য মন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। উপ রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ উল্লাহ্ ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের দপ্তর সম্পাদক, মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক উপদেষ্টা, ১৯৭২ সালে সংসদের ডেপুটি স্পীকার ও স্পীকার, ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতি এবং বাকশাল গঠণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের ২য় রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এছাড়া, তিনি বিচারপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের দায়িত্বও পালন করেছেন। শেখ মুজিবের মন্ত্রিসভায় তিনি বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালের ১০ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হন। একই বছর তিনি পদত্যাগ করেন এবং একজন মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষ দূত নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ৮ আগস্ট তিনি বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রীর পদ লাভ করেন। পরিকল্পণা মন্ত্রী ইউসুফ আলী স্বাধীনতার সনদ পাঠক, মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ ও পু্নর্বাসন দপ্তরের প্রধান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী। স্বাধীনতার পরে শেখ মুজিব সরকার, খন্দকার মোশতাক সিরকার, জিয়াউর রহমান সরকার ও এরশাদ সরকার পর্যায়ক্রমে চারটি ভিন্ন ভিন্ন সরকারের শিক্ষা, সমাজ কল্যাণ, বস্ত্র ও ত্রাণ প্রভৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে প্রায় দশবার মন্ত্রীত্বের শপথ গ্রহণ করেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ফনী ভূষণ মজুমদার ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সরকারে খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা আবদুল মান্নান শেখ মুজিব সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। তৃতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর ১৯৭২ সালে জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ১৯৭৩ সালের ১৬ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের আইন, সংসদ ও বিচার বিষয়ক মন্ত্রী, নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সোহরাব হোসেন স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে তিনি মুজিব নগর সরকারের অন্যতম নীতি নির্ধারকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম মন্ত্রী পরিষদে বন, মৎস্য ও পশু পালন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। এছাড়া আরো যারা মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল (অব.) কেএম শফিউল্লাহ, বিমানবাহিনী প্রধান একে খন্দকার, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এমএইচ খান, বিডিআর ও পুলিশ প্রধানরা। উপরোক্ত সকলেই বাকশালের কার্য নির্বাহী কমিটির সদস্য ও শেখ মুজিবের আস্থাভাজন ছিলেন। অর্থাৎ খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভার ২৩ জনের মধ্যে ২২ জনই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা। এ মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন এইচ টি ইমাম। নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য জানিয়েছিলেন তিন বাহিনী প্রধান। এদের একজন পরে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। আরেকজন এমপি। এসব নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবের শাসনকালে প্রতিবাদের দুঃসাহস দেখাতে পারতেন কিন্তু তারা হয়তো সূযোগের অপেক্ষায় থেকে অনিয়ম ও দুঃশাসনকে মেনে নিয়েছিলেন। বাকশালী শাসনের বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমী ভূমিকায় ছিলেন মাত্র দু’জন-মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেঃ এম এ জি ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। জনগণের অব্যক্ত ভাষা তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন-বাকশালের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করে উভয়ে ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক মেজর জেনারেল সফিউল্লাহকে সরিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব প্রদান করেন। মোশতাক সরকারের ৮৩ দিনের মাথায় ভারতপন্থী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন ও বাকশালী শাসনে ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার কথা বলে ব্রি: খালেদ মোশাররফ ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর রাতে অভ্যুত্থান ঘটান এবং নিজেই আবার চেইন অব কমান্ড লঙ্ঘন করে নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা ও তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তাদের সাথে সমঝোতার অংশ হিসাবে তাদের নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগও করে দেন। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ৬ নভেম্বর খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করে নিজে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৩ নভেম্বর তিনি নিজেকে সেনাবাহিনী প্রধান ঘোষণা করেন। তার আদেশ মোতাবেক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব মিলিটারি স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। ৩রা নেভেম্বর জিয়াউর রহমান যখন গৃহান্তরীণ, খালেদ মোশাররফের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব যখন প্রতিষ্ঠিত তখন জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যা করা হলো। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পরদিন ৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগ ও সিপিবি ৩ থেকে ৪ হাজার কর্মী ও নেতাদের নিয়ে একটি বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল যা শেখ মুজিবের বাসভবন পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সেখানে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছিল। খালেদ মোশাররফের মা ও ভাই রাশেদ মোশাররফ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। তার মা ও ভাই আওয়ামী লীগের মিছিলে যোগ দেয়ায় খালেদ মোশাররফ অত্যন্ত বিচলিত হয়ে বলতে থাকেন-“আমার মা ও ভাই আমার সর্বনাশ করে দিয়েছে।” এদিকে ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কোনো রকমের সরকার আছে কিনা, তা নিয়ে দারুণ উৎকণ্ঠায় পড়ে গেল সাধারণ মানুষ। অপরপক্ষে ১৯৭২ সালে জন্মলগ্ন থেকেই মুজিব সরকারের উৎখাতে বদ্ধপরিকর জাসদের প্রথম সভাপতি মেজর (অব.) এম এ জলিল সাধারণ সেনাসদস্যদের সংগঠিত করতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গঠণ করেন। তিনি ১৯৭৪ সালে গ্রেপ্তার হলে এটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেন লেঃ কর্নেল (অব.) আবু তাহের। ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের অংশ সেনাবাহিনী ও জাসদের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী হিসাবে ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের পর তাহের তৎপর হলেন। সক্রিয় হলো বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। জাসদের সামরিক সংগঠন বিপ্লবী গণবাহিনীও তৎপর হয়। জাসদের শীর্ষ নেতারা জিয়াউর রহমানকে সামনে রেখে অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নেন। সাধারণ সেনাসদস্যদের স্বার্থের দিকটি বিবেচনা করে ও কিছু রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পক্ষ থেকে তৈরি করা হয় ১২ দফা দাবি। তার ১০ নম্বর দফাটি ছিল উল্লেখযোগ্য। এই দফায় বলা হয়েছিল, আগস্ট অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত যেসব সেনা কর্মকর্তা ৩ নভেম্বর বিদেশে চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনতে হবে।
পাদপ্রদীপের আলোয় জিয়াউর রহমান: রাষ্ট্রের যুগসন্ধিক্ষণে ও চরম ক্রান্তিলগ্নে সিপাহী-জনতার বিপ্লবে তিনি মহানায়করূপে রাজনীতির মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ৩রা নভেম্বর অভ্যুত্থানের সময় অন্তরীণ সেনাবাহিনীতে সবচেয়ে জনপ্রিয় জিয়াউর রহমানকে আটকে রেখে খালেদ মোশাররফের সেনাপ্রধান হওয়ার ঘোষণায় সাধারণ মানুষ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। অনেকে দারুণ উৎকণ্ঠার মধ্যে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে জায়নামাজে সিজদায় পড়ে গেলেন। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ক্যান্টনমেন্টে জওয়ানরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা দলে দলে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। রাজপথে ট্যাংক ও কামানসজ্জিত হয়ে বিদ্রোহী সিপাহিরা বিপ্লবের স্লোগান দিতে থাকে। তারা স্লোগান দিচ্ছিল, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ। রাজপথে সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে সিপাহি বিপ্লবের সমর্থনে সংহতি প্রকাশ করা হল। এটাই ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ । জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সৈনিকরা মুক্ত করে আনল। জিয়াউর রহমান জাতির উদ্দেশে একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন। তিনি জনগণের প্রতি শান্ত থাকা এবং নিজ নিজ কর্মসম্পাদনের জন্য আহ্বান জানান। জাসদ ও কর্নেল আবু তাহেরের একটি ভূমিকা ছিল। জাসদ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ নামে একটি গোপন সংগঠন তৈরি করেছিল। এ সংগঠনের আওতায় জড়িত ছিল বেশকিছু সৈনিক। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুব বেশি হবে না। জিয়া বন্দিদশা থেকে তাহেরের চেষ্টায় মুক্ত হলেও তাহেরের হঠকারী ধ্যান-ধারণার সঙ্গে একমত ছিলেননা। তাহেরের ইচ্ছা ছিল, মুক্ত জিয়া তার সঙ্গে শহিদ মিনারে এসে ভাষণ দেবেন এবং তাহের সেনাবাহিনীতে জিয়ার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্যান্টনমেন্টে জিয়ার শুভানুধ্যায়ী সিপাহী ও অফিসাররা তাকে শহিদ মিনারে যেতে বারণ করেন। সবকিছু ভেবেচিন্তে জিয়া শহিদ মিনারে যেতে অস্বীকার করেন। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা স্লোগান তুলল, ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই’, ‘অফিসারদের রক্ত চাই’। ক্যান্টনমেন্টে কয়েকজন অফিসারকে হত্যা করল বিপ্লবী সৈনিকরা। ৭ নভেম্বর সকালে খালেদ বিদ্রোহী সেনাসদস্যদের হাতে নিহত হলেন।
জেনারেল জিয়া সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে সিপাহিদের ধ্বংসাত্মক পথ থেকে নিরস্ত্র করতে সক্ষম হলেন। সেনাবাহিনীতে নিয়ম-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেন। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মতে-জিয়া যদি সেনাবাহিনীতে নিয়ম-শৃঙ্খলা উদ্ধারে সফল না হতেন, তাহলে বাংলাদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দখলে চলে যাওয়ার চরম শঙ্কায় নিপতিত হত। জিয়াউর রহমান নিজের অবস্থান সংহত করার পর জাসদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন। একপর্যায়ে আবু তাহেরসহ জাসদ, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও বিপ্লবী গণবাহিনীর শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হন। তাঁদের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়। আদালত আবু তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। আবু তাহেরের ফাঁসি হয়।
রাজনীতির মঞ্চে ধীরে ধীরে জিয়াউর রহমান অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় তিনি শুরু করেছিলেন, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যার ভাটা পড়েনি। তাঁর এই জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল ইসলামপ্রিয় মানুষের ভালবাসা। তিনি আওয়ামীবিরোধী মনস্তত্ত্ব উগরে দিতে দুটি কার্ড সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিলেন, আর সেগুলো হলো ইসলাম ও ভারত। তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছির সেটি পূরণ করে বিএনপি।
জনগণ তাঁর প্রতি যে আস্থা রেখেছিল সে আস্থা ও প্রত্যাশার প্রতিদান শহীদ জিয়া দেশ-জাতিকে দেয়া শুরু করেছিলেন। দেশপ্রম, স্থিরতা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার প্রয়োগে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সবার আগে বাংলাদেশ। ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে বাংলাদেশ ধাবিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিলেন। মুসলিম বিশ্বের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন ও ইরান-ইরাক যুদ্ধ অবসানে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া ও ইসলামী বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেন। ইন্দো-সোভিয়েত বলয় থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পূর্ব এশিয়ায় চীনের সঙ্গে সখ্য স্থাপন করেন। ইঙ্গ-মার্কিন অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সংশ্লিষ্ট করে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাকশিল্প প্রবেশ করিয়ে এবং রেমিট্যান্স উপার্জনে মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে কার্যকর উদ্যোগ নেন। তিনি অনুভব করেন-আঞ্চলিক পর্যায়ে সহযোগিতা বিস্তৃত না হলে জাতীয় অগ্রগতি ব্যাহত হবে। তাই ভারত ও পাকিস্তান যেসব ক্ষেত্রে চুপচাপ থেকেছে, সেক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার সংকল্প নিয়ে জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অগ্রসর হয়েছে ।
আধিপত্যবাদী ও সম্রাজ্যবাদী শক্তি তাঁর উত্থান মেনে নিতে পারলোনা। বাংলাদেশকে নেতৃত্বহীন করা হলো, ঘাতকের বুলেটে তিনি ক্ষত-বিক্ষত হলেন। সেদিন প্রেসিডেন্টের চট্টগ্রামে কোন রাষ্ট্রীয় সফর ছিলনা। ইরাক ও ইরানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করে দলের অন্তর্দ্বন্দ মেটাতে সেখানে গিয়েছিলেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেনারেল মহব্বতজান চৌধুরীর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাজনৈতিক কোন্দলের সুরাহা করতে তিনি চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। জেঃ চৌধুরী রাত্রি যাপন না করে ফিরে আসার অনুরোধ করেছিলেন। সেকথাও দলের টানে নির্ভীক জিয়া শোনেননি। চট্টগ্রামের ডিসি জিয়াউদ্দিন চৌধুরীকে সফরের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে বিষয়টি জানানো হয় । যদিও এর আগে এ ধরনের সফরের কথা সাধারণত মাসখানেক আগে ডিসিকে জানানো হতো। জিয়ার সফরসঙ্গী ছিলেন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, উপ-প্রধানমন্ত্রী জামাল উদ্দিন আহমেদ, আমেনা রহমানসহ দলের আরও কিছু নেতা। পার্শ্ববর্তী কক্ষে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরী ছিলেন কিন্তু ঘাতকের বুলেটের টার্গেট ছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। ৩০ মে, ১৯৮১ রাতের চতুর্থ প্রহর! ঘড়ির কাটায়- রাত ২.৩০ মিনিট! রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এক কর্মব্যস্ত শুক্রবার সবে শনিবারে গড়িয়েছে। দেশি-বিদেশি চক্রান্তে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য তাঁকে হত্যা করে।
আলেম সমাজ তাঁকে ভালবাসতেন এবং তিনি আলেমগণকে শ্রদ্ধা করতেন ও পরামর্শে নিতেন। আলেম-উলামাদের সান্নিধ্যে পরামর্শের জন্য ছুটে যেতেন। আমার প্রয়াত পিতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রখ্যাত আলেম মোহাম্মদ আবদুল্লাহর সাথে শহীদ জিয়ার সুনিবিড় সম্পর্কের কথা তাঁর মুখে অনেক স্মৃতিচারণ শুনেছি। স্বাধীনতার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া ওয়াজ-মাহফিল সাহসিকতার সাথে পূণরায় চালু করতে সক্ষম হওয়ায় আব্বাকে তিনি মন থেকে শ্রদ্ধা করতেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দিবসে তিনি দাওয়াত দিতেন ও গাড়ী পাঠিয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতেন। তাঁর অনুরোধে সারাদেশের মক্তব ও মাদরাসায় খেদমতের সাথে জড়িতদের ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের কল্যাণে এগিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় ‘বাংলাদেশ ফোরকানিয়া-হাফেজিয়া শিক্ষক সমিতি ‘ প্রতিষ্ঠা করে ১৯৭৮ খ্রী: ঢাকায় মহাসমাবেশ করেছিলেন। আব্বার হুজরাখানা আজিমপুর গোরস্তান সংলগ্ন হওয়ায় গভীর রজনীতে তিনি ছদ্মবেশে গোরস্তানে এসে আব্বাকে ডেকে নিতেন। ইসলাম, দেশ ও দশের সার্বিক কল্যাণ নিয়ে আলোচনা হতো। আমি অনেকদিন আব্বার হুজরা খানায় থাকতাম, আব্বাকে দেখতাম গোরস্তান থেকে এসে ফযরের সালাত আদায়ের জন্য অযু করছেন। জিজ্ঞেস করলেই মুচকী হাসি দিতেন। পরেরদিন মুসল্লীদের সাথে কারগুজারী করতেন। আলেমদের সাহচর্য ও অনুপ্রেরণায় তিনি সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সহ বেশ কিছু ইসলাম বান্ধব বিষয় অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রসহ ইসলামের সাথে সাংঘার্ষিক বেশ কিছু বিষয় প্রত্যাহার করেছিলেন। আব্বাকে দেখেছি জুমআর খুতবায় বা ওয়াজ-মাহফিলে জিয়াউর রহমানের অসামান্য অবদানের প্রশংসা করতেন এবং তাঁর নির্মম শাহাদাতের পর শিশুর মতো বিলাপ করতে দেখেছি।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন ইতিহাসের ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, বিবিসির জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিদের অন্যতম। জিয়াউর রহমান তার রাষ্ট্রনায়কত্ব এবং দৃষ্টিভঙ্গির জন্য দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা দ্বারা সম্মানিত হয়েছিলেন। সৈনিক ও রাজনৈতিক জীবনে জাতির ইতিহাসে তিনি অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। সংবিধানে ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি আপামর জনতার হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিলসংসদ নেতা শাহ আজিজুর রহমান সংসদে ৫ম সংশোধনী বিল উত্থাপন করেন। সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
‘বিস্মিল্লাহির-রহ্মানির রহিম’ সংযোজন করা হয়।
সংবিধান থেকে “বাঙালি জাতীয়তাবাদ” অপসারণ করে “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” অন্তর্ভূক্ত করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকারী সেনা কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিয়ে জারি করে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখ পর্যন্ত সামরিক সরকারের সকল কার্যাবলীর বৈধতা দেওয়া হয়। ফলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয় এবং উক্ত দলগুলোর নিবন্ধনের অনুমতি দেওয়া হয়।
সংবিধানের মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনার আগে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” যুক্ত করা হয়।
সংবিধানের মূলনীতিতে থাকা সমাজতন্ত্রকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে “সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র” রাখা হয় । সমাজতন্ত্রকে অপসারণ করায় মূল্যবোধ ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়।
২৫(২) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে বলা হয়, ‘রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ ও জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবেন।
উপরোক্ত সংশোধনীর মাধ্যমে শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় আম জনতার মনের আকুলতা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদদের সাথে সুষম সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র উচ্ছেদ, বাঙালী জাতীয়তাবাদের স্থলে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রতিস্থাপন, একদলীয় বাকশালী শাসনের স্থলে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ ইসলামী রাজনীতির সূযোগদান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেশ জাগানিয়া কর্মকান্ডের অন্যতম।
বিপ্লবই সমাজ ও ইতিহাসকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার মূল চালিকা শক্তি। কার্ল মার্কস (Karl Marx) যথার্থই বলেছেন-“বিপ্লব ইতিহাসের ইঞ্জিন।” সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছাড়া কোনো বিপ্লব সফল ও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। জুলাই বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে-৭ই নভেম্বরের সিপাহী জনতার বিপ্লবকে যেমন করা হয়েছিল। জনসমর্থন কমে গেলে বিপ্লব টিকে না। যখন বিপ্লব তার ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়, জনগণের কল্যাণে পরিবর্তন আনতে পারেনা, তখনই সে বিপ্লব ব্যর্থ বলে গণ্য হয়। বিপ্লব অনেক সময় লক্ষ্য হারিয়ে ক্ষমতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। জর্জ ওরওয়েল (George Orwell) এর ভাষায়: “সব বিপ্লবই শেষ পর্যন্ত নতুন শাসকদের জন্ম দেয়, যারা পুরনোদের মতোই হয়ে ওঠে।” বিপ্লবী নেতারা যদি নিজেদের স্বার্থে বিভক্ত হন বা ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন, যখন গবেষক বা চিন্তাবিদেরা বিপ্লবের নৈতিকতা ও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যখন বিপ্লব তার প্রতিশ্রুত পরিবর্তন বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, জনগণের আস্থা হারায় ও নৈতিক বৈধতা হারায় এবং নতুন শাসকগোষ্ঠী পুরনো শোষকদের বিচারে কালক্ষেপন করে ও রাজনীতির নামে তাদের রক্ষা করার প্রচেষ্টা চালায়-মহান বিপ্লব অবধারিতভাবে ব্যর্থ হবে। আমরা এমন পূণরাবৃত্তি চাইনা। বিপ্লব ব্যর্থ হলেও বিপ্লবীরা ব্যর্থ নয়। নেলসন ম্যান্ডেলার ঐতিহাসিক উক্তি: “বিপ্লব হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, প্রতিশোধ নয়।”