বাংলাদেশে গণভোট: সংলাপ ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের বিকল্প নেই

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নে অবিলম্বে সরকারি আদেশ জারি করে একটি গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করেছে।উক্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নির্বাচনের দিনসহ তার আগে যেকোনো দিন সরকার জুলাই জাতীয় সনদ–এর ওপর গণভোটের আয়োজন করতে পারে”। সুপারিশে আরো বলা হয়েছে: “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও জাতীয় সংসদ হিসেবে কার্যকর থাকবে। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর থাকবে ২৭০ দিন”। কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘গণভোটের ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এখনো আছে। এই প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন এবং গণভোট অনুষ্ঠানকে সবাই মনে করেছেন যে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য এটা একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত।’ তিনি আরো বলেন- ‘জুলাই সনদ যেন আইনি ভিত্তি পায়, ভবিষ্যতের পথরেখা হিসেবে যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত এবং ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো যেন বাস্তবায়িত হয়। গত ১৭ অক্টোবর সনদ সই হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ভাষায় এই অঙ্গীকার করা হয়েছে যে তারা এগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন।’

বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী গণভোট অনুষ্ঠান ও বাস্তবায়নে দ্বিমত পোষণ করেনি, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। তবে দিন-ক্ষণ নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। তবে শুরু থেকেই তারা বলে আসছে, জুলাই সনদ নিয়ে সংবিধান আদেশ জারি করা যাবে না, সনদকে সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়া যাবে না। দলটি বলছে, আদেশ নয় বরং জুলাই সনদ নিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা যায়। তার ভিত্তিতে গণভোটের জন্য একটি নতুন অধ্যাদেশ করে গণভোট করা যায়। আর যেসব সিদ্ধান্তে দলগুলোর ভিন্নমত আছে, সেগুলো সনদের উল্লেখ থাকবে। সনদের অঙ্গীকারনামায় একটি অঙ্গীকার এভাবে যুক্ত করা হবে যে ভিন্নমতগুলো দলগুলো নির্বাচনী ইশতাহারে উল্লেখ করবে।জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি টেকসই সংস্কার করতে সংবিধান আদেশ না হলেও জুলাই বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে তার ভিত্তিতে গণভোট করার জোর দাবী জানিয়েছিল। আগামী জাতীয় সংসদকে দ্বৈত ভূমিকা পালনের ক্ষমতা ও ভিন্নমত থাকা প্রস্তাবগুলোও সনদে রাখতে চেয়েছিল।
অবশেষে, অনেক তর্ক-বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বাংলাদেশের ২৫টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে বহুল কাঙ্খিত জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে। একটি রাজনৈতিক সনদ হিসাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐকমত্যভিত্তিক গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রস্তাবসমূহ এই সনদে স্থান পেয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো আত্মাহুতি দেয়া ছাত্র-জনতা ওচিরতরে পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণকারীদের প্রতি স্বীকৃতি দিয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর আপামর জনতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল।

সম্প্রতি দেশে গণভোট (হ্যাঁ/না) নিয়ে তুলকালাম কান্ড চলছে। পক্ষ-বিপক্ষ তৈরী হয়েছে মূলতঃ গণভোট অনুষ্ঠানের তারিখ নিয়ে। বিএনপিসহ কয়েকটি দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোটের পক্ষে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি দল চায় জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোট হোক। গণভোটের প্রশ্ন কী থাকবে, ভিন্নমত থাকা প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে—এসব প্রশ্নেও মতভিন্নতা আছে।গণভোট আসলে আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রশাসনিক গণভোট এবং আরেকটি সাংবিধানিক গণভোট। প্রথম গণভোট হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৭ সালে। দ্বিতীয় গণভোট হয় রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে। সবশেষ গণভোট ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
প্রথম গণভোট: জিয়াউর রহমানের আমলে দেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। উদ্দেশ্য ছিল সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া জিয়াউর রহমানের শাসনকাজের বৈধতা দেওয়া। রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তাঁর নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা আছে কি না, সে বিষয়ে দেশের জনগণের মতামত জানতে ওই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল।
১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বেতার ও টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে গণভোটের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় গণভোট: ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ দেশে দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচি এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য ওই গণভোটের আয়োজন হয়েছিল। আগের মতোই ‘হ্যাঁ/‘না’ এই পদ্ধতিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জনগণের আস্থা থাকলে জেনারেল এরশাদের ছবিসহ ‘হ্যাঁ’ বাক্সে এবং আস্থা না থাকলে ‘না’ বাক্সে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
তৃতীয় গণভোট: স্বৈরাচার বিরোধী গণ আন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ। এর ৩ মাসের মধ্যে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপি। ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতির (পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি) সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট মধ্যরাতে সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে বিল পাস হয়।
২০ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের সেই বিধান বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর ওই সংশোধনী বাতিলের মামলায় হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি গণভোটও পুনর্বহাল করে রায় দেয়। সেই রায় কেউ চ্যালেঞ্জ না করায় গণভোট আয়োজনে এখন কোনো বাধা নেই।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এবার গণভোটের লক্ষ্য বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এ ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে গণভোট কি আলাদা হবে, নাকি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই ছেড়ে দিয়েছে ঐকমত্য কমিশন। এই জটিলতাও আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোর অভিভাবকসুলভ আচরণ ইতিপূর্বে অনেক জটিল পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ পরিত্রান পেয়েছে। এক্ষেত্রেও মতদ্বৈততা নিরসণে সকল মহলের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস জাতির ঐকান্তিক প্রত্যাশা।

*রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী
taazabdullah@gmail.com

আরো