জহিরের নিখোঁজ নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে।’’
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
শিরোনামে উল্লেখিত জহির রায়হানের বড় বোন নাফিসা কবীরকে উদ্দেশ্য করে শেখ মুজিবের এই শাসনের অর্থ হতে পারে—তিনি জানতেন কারা অপহরণকারী। সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ রাহুর কবলে বাংলাদেশ গ্রন্থে লিখেন-‘শহীদ বৃদ্ধিজীবি শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্ধানে মিরপুর গিয়ে ছোট ভাই জহির রায়হানও গুম হয়ে গেলে তাঁর বড় বোন নাফিসা কবির এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় হৈচৈ শুরু করেন। তখন ক্ষমতাসীন শেখ মুজিব তাকে ডেকে বলেন- ‘জহিরের নিখোঁজ নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে।’(৮ ডিসেম্বর, ১৯৯৩ইং তারিখে দৈনিক আজকের কাগজ) এরপর নাফিসা কবির নীরব হয়ে যান।
যারা বুদ্ধিজীবদের হত্যা করেছে তাদের ওপর হয়তো মুজিব সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। অথবা হতে পারে হত্যাকারীরা সরকারের চেয়েও শক্তিশালী কেউ। এই ‘কেউ’ যে ভারত হতে পারে, সেটাই তখনকার জন্য স্বাভাবিক। অনেকেই মনে করেন, বুদ্ধিজীবী হত্যা, জহির রায়হানের নিখোঁজের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকারের যে উটপাখিতুল্য ভূমিকা তাতে মনে হয়—বুদ্ধিজীবী হত্যা ও জহির রায়হানের নিখোঁজ বা হত্যার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো মহল জড়িত থাকতে পারে। এর পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। প্রথমত: কলকাতার প্রবাসী আওয়ামী লীগার এবং আওয়ামী সরকার জহির রায়হানকে ভালো চোখে দেখতনা। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে জহির রায়হান কলকাতায় গিয়ে খেয়ে-বসে আয়েশি জীবন কাটাননি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ‘গ্রিন রুম হিস্ট্রি’ তৈরি করেছিলেন। আওয়ামী আদর্শে বিশ্বাসহীন বাঙালিদের নির্মূল করার ষড়যন্ত্র উন্মোচনের পাশাপাশি কলকাতার বিলাসবহুল হোটেলে মেয়ে নিয়ে পড়ে থাকা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রামাণ্য দলিল জহির রায়হান সংগ্রহ করেছিলেন সেটা আওয়ামীলীগ নেতারা জানতেন। ঢাকায় এসেও জহির রায়হান বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রচুর প্রভাবশালী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জহির রায়হান ঘোষণা দিয়েছিলেন—বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনে নীলনকশা তার কাছে আছে, যা প্রকাশ করলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই নেওয়া অনেক নেতার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে পড়বে। ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এই প্রেস ক্লাবে ফিল্ম শো প্রমাণ করে দেবে কার কী চরিত্র ছিল।’ (‘ভাসানী, মুজিব, জিয়া’; জীবলু রহমান, পৃষ্ঠা : ২৬)। কিন্তু জহির রায়হানের জীবনে আর প্রেস ক্লাবে আসা হয়নি। ৩০ জানুয়ারি সকালে কায়েতটুলীর বাসায় জহির রায়হানের কাছে টেলিফোন আসে- ‘শহীদুল্লাহ কায়সার মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে আছেন’। তিনি মিরপুরে ছুটে যান। সেই যে গেলেন আর ফিরে আসেননি।
পরিকল্পিত নির্মম এই ঐতিহাসিক হত্যাকান্ডের যথাযথ বিচার হলে প্রকৃত খুনীরা বেরিয়ে আসতে পারে তাই বিচারপ্রার্থীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রতিবেদন হিমাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে এবং এহেন সব অপকর্ম করা হয়েছিল মহান নেতা শেখ মুজিবের শাসনামলেই। ব্লেম-গেম চললেও কোনো তদন্ত অনুসন্ধান হয়নি, সত্যও উদঘাটিত হতে পারেনি। দায় চাপানো, দায় এড়ানোর কাজ জোরেশোরেই চলেছে-চলছে। প্রশ্ন হলো – হত্যাকারীরা কি এতোই শক্তিশালী ছিল যে, তাদের , স্বাধীনতা পরবর্তী কোনো সরকারই বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। বরঞ্চ আওয়ামী লীগ তদন্ত রিপোর্ট চাপা দিয়ে রেখেছে। এমনকি চলচ্চিত্রকার শহীদুল্লাহ কায়সারের ভাই জহির রায়হানের অন্তর্ধানের ঘটনা রহস্যাবৃত্তই রয়ে গেছে। বিজয় দিবসের ঠিক দু’দিন আগে বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশকে মেধাশূণ্য করার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। কারা করেছিল, কেন করেছিল এসব নিয়ে এখনো বিতর্ক আছে। তবে খোদ শেখ মুজিব এমন হুমকী দিতে পারেন এটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য।
পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঠিক দুই দিন আগে বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের নির্মমতায় গোটা জাতি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সরকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পর পুরো দেশ হানাদার মুক্ত এবং কার্যতঃ মিত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়েছিল। ১৪ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের দিন-ক্ষণ ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় সেসময় প্রকাশ হয়েছিল। বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের আভাস ও আকারে-ঈঙ্গিতে বুঝতে পেরে ১৪ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের সার্বিক প্রস্তুতিও নিয়েছিল। ১৯৯২ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইংরেজি দৈনিকে ‘দি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় চাঞ্চল্যকর একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সাংবাদিক আকবর ইমাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বরাত দিয়ে লেখেন, ‘১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঐ শিক্ষক তাকে জানান যে, ভারতের ছত্রীসেনারা ৮ ডিসেম্বরের মধ্যেই ঢাকায় অবতরণ করে এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। এই কথা জানতে পেরে ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ভারতীয়রা আত্মসমর্পণের মুহূর্তটি দুদিন পিছিয়ে ধার্য করে ১৬ ডিসেম্বর। এ সময়ের মধ্যে বিশেষ করে ১৪ ডিসেম্বর তারা বুদ্ধিজীবী নিধন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।’ (আত্মঘাতী রাজনীতির তিনকাল-সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা :৫৭৫-৫৭৬)
১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ড ও ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ নিয়ে সৈয়দ মবনু ‘লাহোর থেকে কান্দাহার’ নামে একটি বই লিখেন। উক্ত বইয়ে আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে তার কথোপকথনের বিবরণ এভাবেই লিখেছেন—
(১) ‘আপনারা আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলেন কেন?’
রাও ফরমান আলী : … ‘তখন ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে ঢাকাসহ গোটা পূর্ব পাকিস্তান ছিল। আমার প্রশ্ন হলো—তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করল কে? আমি মনে করি, এ জন্য যদি কাউকে দায়ী করতে হয়, তবে তা অবশ্যই ভারতকে।
(২) ‘আচ্ছা বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে রাজাকার বাহিনী কি জড়িত ছিল?’
রাও ফরমান আলী: ‘আমি কী বলব। তবে আমার ধারণা ওরা জড়িত ছিলনা। কারণ আমাদের আত্মসমর্পণের দুদিন আগেই ওরা পালাতে শুরু করে। রাজাকারদের অবস্থা (ছিল) না ঘরকা না ঘটকা। তাদের পক্ষে এত বড় কাজ করার সুযোগই ছিল না।’
(৩) ‘তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন ভারত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তারা করবে কেন?’
রাও ফরমান আলী: ‘হ্যাঁ, ভারত করতেই পারে। আমাদের বা রাজাকারদের যে কারণে সন্দেহ করা হচ্ছে, একই কারণে ভারতও করতে পারে।’ (আবাবীল পাবলিকেশন্স, ২০০০, পৃষ্ঠা : ১৫৬-১৫৭)
দ্ব‘শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনির চৌধুরী, গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবেরসহ অনেক শহীদ বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করলেও আওয়ামী লীগের অনুসারী ছিলেন না। এদের দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উঠতি পুঁজিপতি শ্রেণির প্রতিভূ, চূড়ান্ত বিচারে শ্রম-শোষক বা শ্রেণিশত্রু।… দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে। আওয়ামী লীগের মতো পেটুবুর্জোয়া সংগঠন দিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না। এখানেই ছিল আওয়ামী লীগারদের ভীতি।’ (‘ভাসানী, মুজিব, জিয়া’, জিবলু রহমান, পৃষ্ঠা : ৩১-৩২) এমন ভীতির ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া গেছে মুক্তিযুদ্ধকালে বাম ও আওয়ামী বৈরিতা ও প্রাণঘাতী সংঘাতের মধ্যে। এ ছাড়া শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কারো কারো সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর সুসম্পর্ক ইত্যাদি কারণেও তারা মুক্তিযোদ্ধাদের রোষানলে পড়েছিল। ঢাবি শিক্ষক অধ্যাপক মুনির চৌধুরী এবং ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনের বিষয়টি এখানে উল্লেখ করা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী এবং ১৭ই মার্চকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাবক ‘ড. নীলিমা ইব্রাহিম। এক নিবন্ধে লিখেন- ৭১ সালের শেষদিকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা তাকে বলে গেল; যেন মুনির স্যারকে সতর্ক করে দেয়।’ এ থেকে নিশ্চিত বোঝা যায়, অধ্যাপক মুনির চৌধুরীর ওপর মুক্তিযোদ্ধারা সন্তুষ্ট ছিলেন না। কিন্তু পরে খবর যা রটল, তাতে দেশবাসী জানে অধ্যাপক মুনির চৌধুরী আলবদরদের হাতে নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি ১০ মে (২০০৩) দৈনিক অবজারভার-এর সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে অধ্যাপক মুনির চৌধুরীর ভাই শামসের চৌধুরী ‘মাই ফ্রেন্ড ক্যাপ্টেন নাসের বারী’ নামে যে স্মৃতিকথামূলক নিবন্ধ লিখেন, তাতে সন্দেহ ঘনীভূত হতে পারে। ওই নিবন্ধের লেখক শমসের চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন নাসের বারীর সাথে ঘনিষ্ঠতার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। শমসের চৌধুরী লিখেন- ক্যাপ্টেন নাসের মুনীর চৌধুরীর বাসায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন, ডাল-ভাত খেতেন, বাংলা শিখতেন, জয় বাংলা বলতেন। তাদের এই সম্পর্ক ১৬ ডিসেম্বরের আগে পর্যন্ত ছিল। এ অবস্থায় অধ্যাপক মুনির চৌধুরীকে রাজাকার-আলবদর কীভাবে হত্যা করতে পারে বুঝে আসে না। ৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সামান্যতম পরিচয় (থাকা) ছিল আত্মরক্ষার নিশ্চিত ব্যবস্থা। পাকিস্তানি বাহিনীর পরিচিত কেউ অন্ততঃ সেনাবাহিনীর হাতে মারা পড় না। বরং এসব লোক মুক্তিবাহিনীর সন্দিহান দৃষ্টিতে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে অনেকে অনেক সময়। ড. নীলিমা ইব্রাহিমের কথা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে অধ্যাপক মুনির চৌধুরী মুক্তিবাহিনীর কারো প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন।… (আরেকজন শহীদ বুদ্ধিজীবী) সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক। প্রথমদিকে আর্মিরা তার বাড়ি তছনছ করলেও পরে রাও ফরমান আলীর নির্দেশে সিরাজুদ্দীন হোসেন প্রদত্ত তালিকা অনুযায়ী তার ক্ষতিপূরণ করা হয়। সেই তালিকায় নাকি লুণ্ঠিত মালামালের দশ গুণ দ্রব্যাদি দাবি করা হয়। সব তাকে দেওয়া হয়। পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে তার এমন দোস্তি হলো যে, তাদের দৌলতে তিনি নাকি প্রভূত সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন।’ (আত্মঘাতী রাজনীতির তিনকাল, সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ, পৃষ্ঠা : ৫৬৮)
বিগত ৫০ বছরে বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের বিচারে রাজনৈতিক স্বার্থ গুরুত্ব পেয়েছে। কোন বিশেষ মহলের স্বার্থে দু‘দিন পিছিয়ে ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের দিন ধার্য করা হয়েছিল- এই প্রশ্নোত্তর আমরা খুঁজে ফিরছি অথচ বিচারহীনতার সংষ্কৃতি ও রাজনৈতিক অভিসন্ধি জাতিকে বিভাজিত করেছে, স্বাধীনতার স্বপক্ষের একটি বিশেষ দলকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান রহিত করা হয়েছে সর্বোপরি ফ্যাসিজম কায়েমের মাধ্যমে ভারতের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেসব মহান বুদ্ধিজীবিরা বেঁচে থাকলে হয়তো আধিপত্যবাদ, ফ্যাসিবাদ ও ভারতমুখিতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হতেন এবং প্রতিবন্ধক হিসাবে জোরালো ভূমিকা রেখে সদ্য স্বাধীন দেশের পক্ষে নাগরিকদের সতর্ক করতে পারতেন! ভূক্তভোগী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের চাপে পরবর্তীকালে যে তদন্ত কমিশন (দেশি) গঠন করা হয়েছিল, এর রিপোর্ট আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। যখন তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা দেয়ার সময় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। অথচ রহস্যজনক কারণে এই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। শুধু রিপোর্ট ধামাচাপা দেয়া নয়, বুদ্ধিজীবী হত্যা সম্পর্কিত সংগৃহীত দলিলপত্রও গুম করে ফেলা বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো জহির রায়হানের গুম বা হত্যার কোনো তদন্ত হয়নি। বুদ্ধিজীবী হত্যার দলিলপত্রের মতো জহির রায়হানের গুম হওয়া-সংক্রান্ত পুস্তকাদি এবং তার সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ ফুটেজ, রেকর্ড ও দলিলও গুম হয়ে গিয়েছিল।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শেখ সাহেবদের এমন এড়িয়ে চলার মানসিকতাই দেখা গেছে তদানীন্তন আওয়ামী লীগ সরকারে সর্বত্র। বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকান্ডের অনুসন্ধান ও বিচার আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বারা কবরস্থ করা হয়েছে। ‘আত্মঘাতী রাজনীতির তিনকাল’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ বলেন- “জহির রায়হানের অন্তর্ধানের পর (বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড তদন্ত) কমিটির অন্য সদস্যরা প্রাপ্ত সব তথ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে যান। বঙ্গবন্ধু সব তথ্য এনএসআইয়ের তৎকালীন প্রধান নুরুল মোমেন খান মিহিরের কাছে দিতে বলেন। সে অনুযায়ী জমা দেওয়া হয়। এ সম্পর্কে ৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন, ড. কামাল হোসেন সর্বশেষ সেগুনবাগিচায় একটি সরকারি অফিসে তিন ট্রাংকভর্তি সেসব দলিলপত্র দেখেছেন। কিন্তু এখন আর বুদ্ধিজীবী হত্যা অনুসন্ধানে দেশের প্রথম এবং শেষ তদন্ত কমিটির সেসব দলিলের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।'(পৃষ্ঠা : ৫৭২-৫৭৫)
শহীদ জহির রায়হানের সাথে আরেকজনের ভাগ্যও সেদিন নির্ধারিত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীর স্টাফ অফিসার সেলিম। ২৪মে, ১৯৯২ তারিখে শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার দৈনিক বাংলার বাণীতে প্রকাশিত ‘কবিতা মিলনকে মিথ্যা সান্ত্বনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন- ‘৩০ জানুয়ারি (১৯৭২) জহির রায়হান একটি ফোন পেয়ে মিরপুর ছুটে গিয়েছিলেন। এ কথা বহুবার লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু বলা হয়নি সেলিমের কথা। সেদিন সেলিমও সে রকমেরই একটি ফোন পেয়ে প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীকে না বলেই জহির রায়হানের সঙ্গে মিরপুর ছুটে গিয়েছিলেন। তারপর দুজনের ভাগ্যের একই নিষ্ঠুর পরিণতি। দুজনই নিখোঁজ। সেলিমের মা এ সংবাদ পেয়ে প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। সেলিম বঙ্গভবনের যে ঘরটিতে থাকতেন, ইত্যবসরে সে ঘর থেকে সব কাগজপত্র, কাপড়-চোপড় উধাও। শহীদ সেলিমের মা অনেক চেষ্টা করেও কোনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেননি। রহস্য রহস্যই থেকে গেল। জহির রায়হানও নিখোঁজ হওয়ার পর বুদ্ধিজীবী হত্যার কোনো ধরনের কাগজপত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাগজপত্রগুলো কোনো হদিসই পাওয়া গেল না। শহীদ সেলিমের মায়ের মতে, বঙ্গভবনের ওর ঘর থেকে যে প্রয়োজনীয় কাগজগুলো উধাও হয়েছিল, সেগুলো সম্ভবত তদন্ত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রই হবে। খোদ বঙ্গভবন থেকে জিনিসপত্র উধাও হয়ে যাবে, তা ভাবতেও বিশ্বাস হয় না। শহীদ সেলিম বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের কাজে সরাসরি জড়িত ছিলেন, এ কথা আমি আগে থেকে জানতাম না। আমি কেন আর কেউ জানে কি না, তাও জানি না। সেলিমের নিখোঁজ রহস্য যেমন গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত হয়নি, তেমনি জহির রায়হানের নিখোঁজ রহস্যও গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ এটা একটা গভীর ষড়যন্ত্র।’ …পান্না কায়সার আরো বলেছেন- ‘খোদ বঙ্গভবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উধাও হয়ে যাবে, সেটা ভাবনারও অতীত। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্টের ভবন থেকে কাগজপত্র উধাও করতে পারে কারা? রাজাকার বা পাকিস্তানপন্থিরা অবশ্যই নয়। এটা করা সম্ভব একমাত্র তাদের পক্ষে, যারা ক্ষমতার আশেপাশে ছিলেন।’ কাগজপত্র, দলিলাদি উধাও করা এবং জহির রায়হান ও সেলিমকে গুম করার কাজে ক্ষমতার আশপাশের লোকরা জড়িত থাকতে পারেন, আবার ক্ষমতার মাথার ওপরের লোকরাও হতে পারেন। তারা শেখ মুজিব ও তার সরকারের চেয়েও শক্তিমান হতে পারেন ‘।

মুক্তিযুদ্ধকালে পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান উদ্বাস্তু শিবিরে আওয়ামী লীগ নেতাদের অপকর্মের অনেক ফুটেজ ও ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেন, যা দিয়ে তিনি ডকুমেন্টারি বানাতে চেয়েছিলেন। এ ছাড়াও কলকাতায় নেতাদের দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, যৌন কেলেঙ্কারি, ভোগবিলাসসহ বিভিন্নমুখী অপকর্মের প্রামাণ্য দলিল ছিল তার কাছে, ছিল সচিত্র দৃশ্যও। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেই ডকুমেন্ট ও ফিল্মগুলো সেখানেই চুরি হয়ে যায়। তিনি তখন কলকাতার বিশিষ্ট কবি ও লেখক মৈত্রেয়ী দেবীর স্কুল বাড়ির শিবিরে থাকতেন। জহির রায়হানের ধারণকৃত এসব সচিত্র দলিল ফাঁস হয়ে গেলে মুক্তিযুদ্ধের সংকটময় সময়ে আওয়ামী লীগের কথিত নেতাদের আসল রূপ উন্মোচন হয়ে যাবে বলে এ চুরি তারাই করিয়েছেন বলে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী এবং পরিকল্পক কারা ছিল,তা সন্তর্পণে ও সংগোপনে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ভারতের ‘দ্য নিউ এইজ’ পত্রিকায় বলা হয়, বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটির সভাপতি চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান আমাদের জানিয়েছেন-‘আলবদরদের কার্যকলাপ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা একই সঙ্গে অপরাধীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝার জন্য নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে যখন নিহত বাবা ও ভাইয়ের দেহের অবশেষ ঢাকার বধ্যভূমিতে খুঁজে ফিরছিলেন, তখন আমাদের ধারণা ছিল যে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর নিশ্চিত পরাজয় উপলব্ধি করে পশুরা ক্রোধান্ধ হয়ে কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করেছে। কিন্তু পরে বুঝেছি ঘটনা তা ছিল না।’ ঘটনা কী ছিল জহির রায়হানের নিখোঁজ বা হত্যার পর, তা আর জানা যায়নি। জানা যায়নি জহির রায়হানের কথিত হত্যাকারী রফিককে সপরিবারে আমেরিকায় কে পাঠিয়েছিল। আজকের কাগজের ৮ ডিসেম্বর ৯৩ সংখ্যায় ‘জহির রায়হানের হত্যাকারী রফিক এখন কোথায়’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে শহিদুল ইসলাম মিন্টু লেখেন, ‘জহির রায়হানের প্রথমা স্ত্রী সুমিতা দেবী বলেছেন, আমার বিশ্বাস জহির মিরপুরে মারা যায়নি। ঘাতকরা তাকে অন্য কোথাও হত্যা করেছে। সেদিন সকাল ৮টার দিকে জহিরের একটি ফোন আসে। ফোনটা ধরেছিল সুরাইয়া নিজে। রফিক নামে কেউ একজন টেলিফোন করেছিলেন। আমরা যে রফিককে চিনতাম, তিনি ইউসিস-এ চাকরি করতেন। কেন তড়িঘড়ি করে জহির রায়হানের কথিত হত্যাকারী এই রফিককে সপরিবারে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো।’ এই রফিক কে ছিলেন, কী তার রাজনৈতিক পরিচয় ছিল; এসব প্রশ্ন সবই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধিজীবী হত্যা বিষয়ে মানুষের দৃষ্টিকে একদিকে রাজাকার, আলবদরদের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় করা হয়েছে। অন্যদিকে তেমনি বুদ্ধিজীবী হত্যার নেপথ্য কারিগরদের আড়াল করার জন্য বুদ্ধিজীবী হত্যা-সংক্রান্ত সব বিষয়কে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়েছে। ড. নীলিমা ইব্রাহিমসহ কয়েকজন শেখ মুজিবরকে পীড়াপীড়ি করছিল বুদ্ধিজীবীদের জন্য আলাদা স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য। বিরক্ত হয়ে শেখ সাহেব বললেন, ‘আপা এত বেশি মিনার বানালে এসবের ভেতরে গরু বেঁধে রাখবে।’ (বাংলাবাজার, উপ-সম্পাদকীয়, ১৬ মার্চ, ১৯৯৮)
আওয়ামী লীগের নেতাদের বেশির ভাগই পরিবার-পরিজন নিয়ে কলকাতায় বেশ আয়েশি জীবনযাপন করেছেন। তাদের বসবাস ছিল অভিজাত এলাকাগুলোতে। সন্ধ্যা হলেই অধিকাংশ সময়ে তারা ব্যস্ত থাকতেন পার্ক স্ট্রিটের অভিজাত হোটেল, রেস্তোরাঁয় ও নাইট ক্লাবে। বেশুমার খরচের জন্য তারা ‘জয় বাংলা’র লোক বলে পরিচিত ছিলেন। হোটেল গ্র্যান্ড, প্রিন্সেস, ম্যাগস, ট্রিংকাস, ব্লু ফক্স, মলিন রো, হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশনাল প্রভৃতি অভিজাত হোটেল, সুরিখানা ও নাইটক্লাবগুলো ‘জয় বাংলা’র লোকের জমজমাট আসর বসত। তখন কলকাতায় ‘জয় বাংলা’র লোক মানেই বাড়তি খাতির। বয়-বাবুর্চিরাও তাদের আগমনে উপরি বকশিশ পাওয়ার আশায় ভীষণ খুশি হতেন। খুব জানতে ইচ্ছে করে, কলকাতার অভিজাত নাইটক্লাবে বসে মদের গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়ে, হাঁটু সমান কাদা পানিতে প্রায় ডুবন্ত মুক্তিযুদ্ধের শিবিরগুলোতে প্রশিক্ষণরত হাজার হাজার তরুণের কথা তাদের একবারও কি মনে পড়ত? মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাদের দরদ থাকবে কী করে? কী করে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের কষ্ট উপলব্ধি করবেন? কারণ, যুদ্ধের মাঠেই তো ছিলেন না আওয়ামী লীগের নেতারা। একবার কলকাতায় এক সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়লে কলকাতার পুলিশ তাকে উদ্ধার করে, যা সে সময় প্রবাসী সরকারের জন্য ভীষণ লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও লেখক আহমেদ ছফা এ ঘটনাটিকে তার কলমে এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘যে সকল মানুষকে দেশে থাকতে শ্রদ্ধা করতাম, কলকাতায় অনেকের আচরণ দেখে সরল বাংলায় যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ়-তাই হতে হচ্ছে।’ রাজনৈতিক নেতাদের ভোগবিলাস ও বেহিসেবি চালচলন নিয়ে তিনি তার অলাতচক্র উপন্যাসের ৮১ পৃষ্ঠায় এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন- ‘কলকাতা এলে মাথায় খুন চেপে বসে। ইচ্ছে জাগে এ ফর্সা কাপড় পরা তথাকথিত নেতাদের সবকটাকে বলি, এ্যায়াসা দিন নেহি রয়েগা। একদিন আমরা দেশে ফিরে যাব। কলকাতায় নরম বিছানায় ঘুমিয়ে পোলাও-কোর্মা খাওয়ার মজা তখন ভালো করে দেখিয়ে দেব।’
মুক্তিযুদ্ধের সত্যানুসন্ধানে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনাবলী মুক্তিযুদ্ধেরই অংশ, যা আমরা অনেকেই জানি না। শহিদজায়া মুশতারী শফী বাংলাদশে দেবতুল্য একজন লেখক এম আর আকতার মুকুল সম্পর্কে লিখেন- “মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘চরমপত্র’র প্রখ্যাত এম আর মুকুল প্রবাসী সরকারের মন্ত্রীদের সমপরিমাণ বেতন বৃদ্ধি না করায় এক সপ্তাহের জন্য চরমপত্র প্রচার বন্ধ রেখেছিলেন। প্রবাসী সরকারের পরপর দুটো বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবও তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটি যেহেতু খুবই জনপ্রিয়, তাই সরকার তার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক আবুল কাশেম সন্দীপ ক্ষোভ প্রকাশ করে সেদিন মুশতারী শফীকে বলেছিলেন, ‘আপা, আমরা যে খেয়ে না খেয়ে, সাত দিন গোসল না-করে, মশার কামড় খেয়ে, নির্ঘুম রাত কাটিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ করছি, তারা কী এমন করবেন? দেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হবেন? অথচ দেখবেন, এরাই একদিন হবেন দেশের প্রথম শ্রেণির মুক্তিযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক নাগরিক। সুযোগের শীর্ষে অবস্থান করবেন। ‘( স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন-পৃষ্ঠা ৩৩২)।
মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী মনেপ্রাণে স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির ধারক হলেও বাংলাদেশে সর্বভারতীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি ১৯৭২ সালের পর কয়েক বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস নয় বরং কাল দিবস হিসেবে উদযাপন করতেন। তার কারণ হিসাবে তার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল—যখন জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেন; তখন (ভারতীয়) জেনারেল অরোরার সঙ্গে ১০০ জন ভারতীয় ব্যবসায়ীর একটি দল, ১৫০ জন সাংবাদিক এবং ২০০ জন আমলা ছিল। (দি টেলিগ্রাফের রিপোর্ট, সাংবাদিক আকবর ইমাম, ১৬ ডিসেম্বর-১৯৯২)। মনে করা হয়—এসব ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও আমলা সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের ব্যবসা, অর্থনীতি ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই এসেছিল। প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিল ভারতের হাতে, তাদের সহায়তায় সবকিছু ভারতের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে পরাধীন করার আয়োজন করা হয়েছিল। এসব নানা কারণে শেখ মুজিব সরকার মাওলানা ভাসানীকে একসময় গৃহ অন্তরীন করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাইয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ধামাচাপা দেয়া হয়েছে-মুক্তিযুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ও মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের সঠিক তদন্ত ব্যাহত করা হয়েছে-তদন্ত প্রতিবেদন ও তদন্তকাজে ব্যবহৃত ডকুমেন্টস উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুম করা হয়েছে যেমনটি বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাসকে গুম করা হয়েছে। সমগ্র জাতি এই বিভ্রান্তি ও পরিকল্পিত অপরাধের বেড়াজাল থেকে পরিত্রান চায়- বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের সঠিক তদন্ত ও বিচার, মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত শহীদদের সংখ্যা উদঘাটন চায়।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মী।