জাতির ভাগ্যাকাশ থেকে কালো মেঘ সরে যাবার পূর্বাভাস
মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিরোধী দলসমূহের আহুত মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংস ঘটনা, ব্যাপক ধরপাকড় এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফলে বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এর পরপরই অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অংশগ্রহণ, প্রতিযোগিতা, গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটাধিকার প্রশ্নে দেশ-বিদেশে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যকারিতা, আইনের শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনপরিসরে অসন্তোষ ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনকে কেবল সরকারি চাকরিতে কোটা বৈষম্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এর প্রকৃত ব্যাপ্তি ও তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করা যায়না। বরং দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচার ব্যবস্থা, আর্থিক খাত, প্রশাসনিক কাঠামো, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে সঞ্চিত অসন্তোষ ও বৈষম্যের অনুভূতি আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত করে তোলে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, কোটা ইস্যু ছিল সেই সঞ্চিত ক্ষোভের দৃশ্যমান ও তাৎক্ষণিক প্রকাশের একটি উপলক্ষ মাত্র।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র ও যুবসমাজ যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল, ২০২৪ সালের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও অনেকেই সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতিফলন দেখতে পান। তবে ২০২৪ সালের আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিলÑপ্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ও অপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষার্থী নেতৃত্বের মাধ্যমে আন্দোলনের বিকাশ। পূর্বে জাতীয় পর্যায়ে সুপরিচিত ছিলেন নাÑএমন একদল শিক্ষার্থীর সাংগঠনিক উদ্যোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক সমন্বয় এবং ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলন দ্রুত দেশব্যাপী বিস্তার লাভ এবং পরবর্তীকালে তা বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল।
সামগ্রিক বাস্তবতায় দেশের ছাত্রসমাজের একটি বড় অংশ উপলব্ধি করে যে, কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষত সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রেক্ষাপটে বৈষম্যের প্রশ্নটি শিক্ষার্থীদের কাছে একটি তাৎক্ষণিক ও বাস্তব ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে এই আন্দোলনের পেছনে কেবল কোটা সংস্কারের দাবি নয়; দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত বঞ্চনা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, সুশাসনের প্রত্যাশা, জবাবদিহিতার অভাব এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে তরুণ সমাজের উদ্বেগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ফলে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুধুমাত্র একটি একক দাবিনির্ভর আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রত্যাশার প্রতিফলনে পরিণত হয়। আন্দোলনের ক্রমবিকাশে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সঙ্গে সাধারণ জনগণের সহানুভূতি ও সম্পৃক্ততার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের তৎপরতা বৃদ্ধি পায় এবং জুলাই ২০২৪-এ আন্দোলন দেশব্যাপী এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলনের রূপ ধারণ করে। এই প্রেক্ষাপটেই জুলাই আন্দোলনকে বুঝতে হলে ২০২৩ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পূর্ববর্তী রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের কোটা পুনর্বহাল রায়-এর মাধ্যমে সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে ২০১৮ সালে বাতিল হওয়া কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত আসার রায়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অনেক শিক্ষার্থীরা মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার এমন সিদ্ধান্তে সংঘটিত হতে থাকে। হাইকোর্টের রায়ের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” ব্যানারে সংগঠিত হতে শুরু করেন। তাদের মূল দাবি ছিলÑ
কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার;
মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা;
রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশব্যাপী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও সমাবেশ ডাক দেয়া হয়। স্কুল কলেজ ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীরা ক্রমান্বয়ে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। গুম, খুন, আয়নাঘর, রাজনৈতিক দুবৃত্তায়ন, দুঃশাসন ও দুর্নীতির কারণে সরকার চরমভাবে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে এবং সেই কারণে কোটাবিরোধী এই আন্দোলন ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের বিষয়টি বিচারাধীন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে বলে জানানো হয়। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন- সরকার হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে এবং বিষয়টি আদালতেই নিষ্পত্তি হবে (৯ জুন, ২০২৪)। তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেয়ায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে চরম হতাশার সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথা ঋধপবনড়ড়শ, গবংংবহমবৎ, ডযধঃংঅঢ়ঢ়, ঞরিঃঃবৎ ইত্যাদি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্দোলনের কর্মসূচি, ও তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দেশব্যাপী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পায়। ৩০ জুন পর্যন্ত আন্দোলন মূলত শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ, সংগঠনগত প্রস্তুতি এবং দেশব্যাপী সংহতির ভিত্তি দৃঢ় হয়ে ওঠে, যা পরবর্তী জুলাই মাসে আন্দোলনের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ ভূমিকা রাখে। সাংগঠনিক ভিত্তি গঠণের অংশ হিসাবে জুলাই মাসের বৃহৎ কর্মসূচিগুলোর জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বয় কমিটি ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক পূর্বেই গড়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের কাছে এই আন্দোলন গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে অভিভাবক, শিক্ষক ও সাধারণ জনগণের একটি অংশ শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন।
অতি দ্রুত আন্দোলনের পরিসর সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং প্রাথমিকভাবে কোটা সংস্কারের দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হলেও জুলাই মাসে ছাত্র সমাজের অসম সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা, সরকারে গণবিরোধী কার্যকলাপ ও বিভিন্ন বাহিনীর নৃশংসতা, হতাহত এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎঘিরে আন্দোলনের পরিধি ও দাবির প্রকৃতি পরিবর্তিত হতে থাকে। জুলাই মাসে উপুর্যুপুরি ধারাবাহিক কর্মসূচি, পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং সরকারী পেটুয়া বাহিনীর নৃশংসতার ফলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
৩০ জুন ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে সেই সন্ধিক্ষণ, যা সুশৃঙ্খল আল্টিমেটামের পর্ব শেষ করে ১ জুলাই থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে। ৩০ জুনের নতুন দফার ধারাবাহিকতায় ঠিক পরদিন অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৪ তারিখে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্ল্যাটফর্মের নাম পরিবর্তন করে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ৩০ জুন, ২০২৪-এর পূর্ববর্তী সময়টি ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি ও সংগঠনের পর্যায়। হাইকোর্টের কোটা পুনর্বহাল রায়, শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক কর্মসূচি, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সমন্বয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার জুলাই মাসের আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
১ জুলাই, ২০২৪ থেকে ছাত্র আন্দোলন অত্যন্ত তীব্র রূপ লাভ করে এবং শিক্ষার্থীরা সারা দেশে রাজপথ ও রেলপথ অবরোধ বা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। মূলতঃ জুন মাসের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন জুলাই মাসে অশান্ত হয়ে উঠে, চরিত্র ও গতিপথ পরিবর্তন হয় এবং কোটা বিরোধী আন্দোলন রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে। (চলবে)
*রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী।