হাসপাতালের প্রবৃদ্ধি আটকে যেতে পারে কোথায়?
মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
একটি হাসপাতালের বিজ্ঞাপন বাড়ছে, ওয়েবসাইটে মানুষের আনাগোনা বাড়ছে, ফোনকলও আসছে—তারপরও প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না কেন? এর উত্তর সবসময় প্রচারণার ঘাটতিতে থাকে না। অনেক সময় সমস্যা লুকিয়ে থাকে রোগীর চাহিদা তৈরি হওয়ার পর থেকে সেবা গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে।
স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করতে গিয়ে আমার কাছে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে—প্রবৃদ্ধি শুধু মানুষের কাছে পৌঁছানোর বিষয় নয়; মানুষের প্রয়োজনকে কার্যকরভাবে সেবার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ও।
একজন মানুষ কোনো চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে জানতে পারলেন। তিনি অনলাইনে চিকিৎসকের তথ্য খুঁজলেন, ফোন করলেন কিংবা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য পরিষ্কার না হলে, যোগাযোগ করতে অসুবিধা হলে অথবা পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝতে না পারলে তাঁর যাত্রা সেখানেই থেমে যেতে পারে।

প্রতিষ্ঠানের কাছে হয়তো এটি একটি হারানো লিড। কিন্তু বাস্তবে এটি একই সঙ্গে একটি অপূর্ণ সেবাযাত্রা এবং সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির একটি সংকেত।
কতজন মানুষের কাছে পৌঁছানো গেল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু কতজনের প্রয়োজনকে সঠিকভাবে সেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই হাসপাতালের প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো প্রয়োজন।
ধরা যাক, একটি প্রচারণার পর কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিষয়ে ফোনকল বেড়েছে। শুধু ফোনকলের সংখ্যা দেখে প্রচারণাকে সফল বলা যায় না। জানতে হবে, ফোনকারীরা প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়েছেন কি না, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পেরেছেন কি না এবং সেবাটি তাঁদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না।
আবার যোগাযোগের পর কেউ হাসপাতালে না এলে তার কারণও এক রকম নয়। কেউ হয়তো শুধু তথ্য জানতে চেয়েছেন, কেউ পরে চিকিৎসা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, আবার কেউ যোগাযোগের প্রক্রিয়ায় অসুবিধায় পড়েছেন। তাই প্রতিটি অসম্পূর্ণ যাত্রাকে একইভাবে ব্যাখ্যা করলে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ডেটার প্রকৃত মূল্য এখানেই—সংখ্যা গণনা করা নয়, সংখ্যার পেছনের কারণ খুঁজে দেখা।
প্রবৃদ্ধির প্রথম শর্ত তাই আরও বেশি প্রচারণা নয়; কোথায় মানুষ এগোতে পারছেন না, তা বোঝা।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো সেবার সক্ষমতা। কোনো চিকিৎসাসেবার চাহিদা বাড়লেই যে প্রতিষ্ঠান সেই চাহিদা কার্যকরভাবে পূরণ করতে পারবে, এমন নয়। চিকিৎসকের সময়সূচি, অ্যাপয়েন্টমেন্টের সুযোগ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কর্মীদের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়—সবকিছুর ওপর নির্ভর করে রোগী কতটা সহজে সেবা পাচ্ছেন।
এখানে ভারসাম্য জরুরি। প্রচারণার মাধ্যমে যে চাহিদা তৈরি করা হচ্ছে, সেবাব্যবস্থার প্রস্তুতিও তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যথায় মানুষের আগ্রহ তৈরি হলেও প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা দেওয়া কঠিন হতে পারে।
তবে প্রবৃদ্ধির অর্থ শুধু আরও বেশি রোগী সামলানো নয়। হাসপাতালের চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবার মান, নিরাপত্তা এবং রোগীর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েই প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। কারণ সক্ষমতার বাইরে চাহিদা তৈরি হলে তার প্রভাব রোগীর অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সুনাম—দুটির ওপরই পড়তে পারে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়। মার্কেটিং মানুষকে সেবা সম্পর্কে জানায়, ডিজিটাল মাধ্যম তথ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে, জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা তুলে ধরে। কিন্তু রোগীর যাত্রা সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন চিকিৎসক, নার্সিং, ডায়াগনস্টিক, রোগীসেবা, বিলিং এবং অপারেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব দলের সহযোগিতা।
রোগী এই বিভাগগুলোকে আলাদা করে দেখেন না। তাঁর কাছে পুরো হাসপাতালটাই একটি সেবা-ব্যবস্থা।
তাই একটি বিভাগ ভালো কাজ করলেও অন্য কোনো ধাপে জটিলতা থাকলে সামগ্রিক ফল প্রত্যাশার চেয়ে কম হতে পারে। প্রবৃদ্ধি পর্যালোচনায় শুধু বিভাগভিত্তিক ফলাফল নয়, বিভাগগুলোর মধ্যে রোগীর যাত্রা কতটা নির্বিঘ্ন—সেটিও দেখা প্রয়োজন।
এখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ডেটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসন্ধান, ফোনকলের ধরন, অ্যাপয়েন্টমেন্টের তথ্য, রোগীর মতামত এবং সেবা গ্রহণের প্রবণতা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে কোথায় উন্নতির সুযোগ আছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
তবে সব তথ্য এক জায়গায় থাকলেই ভালো সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হয় না। তথ্যের নির্ভুলতা, গোপনীয়তা, যথাযথ ব্যবহার এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে রোগীর গোপনীয়তা ও প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা মেনে চলা অপরিহার্য।
একইভাবে, বড় সংখ্যাকে সবসময় বড় সাফল্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। একটি প্রচারণা অনেক মানুষের কাছে পৌঁছালেও যদি তা প্রাসঙ্গিক তথ্য না দেয়, তাহলে তার মূল্য সীমিত হতে পারে। বিপরীতে, তুলনামূলক কম মানুষের কাছে পৌঁছানো কোনো প্রচারণা যদি সঠিক রোগীকে উপযুক্ত সেবা খুঁজে পেতে সাহায্য করে, তাহলে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল।
প্রবৃদ্ধি পরিমাপের ক্ষেত্রে তাই শুধু কতটা কার্যক্রম হয়েছে, তা নয়; সেই কার্যক্রম রোগী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য কী পরিবর্তন এনেছে, সেটিও জানতে হবে।
আরেকটি বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত হয়—সেবা গ্রহণের পর রোগীর অভিজ্ঞতা। একজন রোগী প্রথমবার সেবা নেওয়ার পর কী অভিজ্ঞতা পেলেন, পরবর্তী নির্দেশনা বুঝতে পারলেন কি না এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফলো-আপের সুযোগ পেলেন কি না, এসব বিষয়ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত রোগীকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার হাসপাতালে আনা নয়; বরং তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ চিকিৎসা, ধারাবাহিক পরিচর্যা এবং প্রয়োজনীয় ফলো-আপ নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্যসেবায় টেকসই প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা রোগীর প্রকৃত প্রয়োজন ও সেবার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
আমার কাছে হাসপাতালের প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষণের সবচেয়ে কার্যকর প্রশ্নগুলো হলো—মানুষ আমাদের সেবা সম্পর্কে জানতে পারছেন কি না, প্রয়োজনীয় তথ্য পাচ্ছেন কি না, উপযুক্ত সেবা গ্রহণ করতে পারছেন কি না এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু মার্কেটিং টিম দিতে পারবে না। প্রয়োজন হবে ডিজিটাল, চিকিৎসা, নার্সিং, রোগীসেবা, অপারেশন ও ব্যবস্থাপনা—সব পক্ষের তথ্য ও অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে দেখা।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা সক্ষমতা, প্রযুক্তি এবং যোগাযোগে বিনিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পার্থক্য গড়ে দেবে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সক্ষমতাকে মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারছে।
হাসপাতালের প্রবৃদ্ধি কোথায় আটকে আছে, তার উত্তর সবসময় বাজারের বাইরে থাকে না; অনেক সময় তা প্রতিষ্ঠানের নিজের প্রক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
তাই আরও বেশি প্রচারণা শুরু করার আগে একটি প্রশ্ন করা দরকার—যাঁরা ইতিমধ্যে আমাদের সেবা খুঁজছেন, তাঁদের জন্য আমরা কি পথটি যথেষ্ট সহজ করতে পেরেছি?
কারণ টেকসই প্রবৃদ্ধি শুধু নতুন চাহিদা তৈরি করে আসে না।
এটি আসে মানুষের প্রয়োজন বোঝা, সেবার সক্ষমতা কাজে লাগানো এবং পুরো প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত উন্নত করার মাধ্যমে।
মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম
