যে ঘরে মায়ের দোয়া আছে, সে ঘরে বরকত ও শান্তি থাকে
মা মানেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, মানবজীবনে সন্তানের সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে নিঃস্বার্থ এবং সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাত্র। একজন সন্তানের জন্ম থেকে শুরু করে তার লালন-পালন, শিক্ষা, চরিত্র গঠন ও জীবনের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে মায়ের অবদান অপরিসীম। তাই মা শুধু একজন অভিভাবক নন, তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম আশ্রয় এবং প্রথম ভালোবাসা। অথচ সেই মায়ের প্রতি চরম অবহেলার যে চিত্র দেখা গেল সেটা কোনভাবেই ভদ্র-অভদ্র কোন সমাজেই কাম্য নয়। উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের মার যদি এই দূরবস্থা হয় তাহলে সেই শিক্ষা প্রভাব-প্রতিপত্তি কতটুকু কাজে লাগবে! হ্যাঁ, নূর জাহান বেগমের এক ছেলে যুগ্ম সচিব, এক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং এক মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। অথচ তিনি একাকী ঘরে নিবৃতে মারা গেলেন! সংবাদপত্রে প্রচারিত রিপোর্টে
গর্ভধারিনী মায়ের সন্তানের বিভৎসতা প্রকাশ পেয়েছে-“মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে যে বাসায় থাকতেন, সেই বাসার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, নূর জাহান বেগমের ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। মরদেহের ফুটেজেও নূর জাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখেছেন।” ইসলামে মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। মহান আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিশেষভাবে মায়ের কষ্ট ও ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একজন ব্যক্তি রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমার উত্তম ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি অধিকারী কে?” তিনি তিনবার বলেছিলেন, “তোমার মা”, তারপর বলেছিলেন, “তোমার বাবা”। এ থেকেই মায়ের মর্যাদা ও গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন শুধু সামাজিক বা ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, এটি নৈতিক কর্তব্যও বটে। মায়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁর সেবা করা, তাঁর সুখ-দুঃখে পাশে থাকা, ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং তাঁর প্রতি নম্র ও ভদ্র আচরণ করা সন্তানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। যে সন্তান মাকে সম্মান করে, সমাজেও সে সম্মানিত হয় এবং তার জীবনে শান্তি ও কল্যাণ নেমে আসে।
অন্যদিকে, মায়ের প্রতি অবহেলা ও অসদাচরণের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। যে সন্তান মায়ের কষ্টের মূল্য দেয় না, তাঁর প্রয়োজনের প্রতি উদাসীন থাকে কিংবা তাঁকে অসম্মান করে, সে শুধু মানবিক মূল্যবোধ থেকেই বিচ্যুত হয় না, ধর্মীয় দৃষ্টিতেও গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হয়। মায়ের অভিশাপ ও কষ্ট সন্তানের জীবনে অশান্তি, ব্যর্থতা এবং মানসিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। সমাজেও এমন ব্যক্তি সম্মান হারায় এবং মানুষের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়।
আমাদের চর্তুু্দিকে অনেক বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানের অবহেলার শিকার হচ্ছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কর্মব্যস্ততা বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে তাঁদের প্রতি দায়িত্ব ভুলে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মনে রাখতে হবে, আজ আমরা যেভাবে আমাদের মায়ের সঙ্গে আচরণ করব, ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানরাও আমাদের সঙ্গে সেভাবেই আচরণ করতে পারে। *“মায়ের ঋণ কোনোদিন শোধ করা যায় না; শুধু ভালোবাসা ও সেবার মাধ্যমে তার কিছুটা প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করা যায়।”*
প্রিয় কবি আবুল হোসেন মিয়া (১৯২০ − ২০০০) রচিত কবিতা দিয়ে শেষ করছি-
*একটু খানি*
একটু খানি স্নেহের কথা একটু ভালবাসা,
গড়তে পরে এ দুনিয়ায় শান্তি সুখের বাসা।
একটু খানি অনাদর আর একটু অবহেলা,
গুছিয়ে দিতে পারে মোদের সকল লীলা খেলা।
একটু খানি ভুলের তরে অনেক বিপদ ঘটে,
ভুল করেছেন যারা সবাই ভুক্তভোগী বটে।
একটু খানি বিষের ছোঁয়া মরণ ডেকে আনে,
এই দুনিয়ার ভুক্তভোগী সকল মানুষ জানে।
একটু খানি ছোট্ট শিশুর একটু মুখের হাসি,
মায়ের প্রানে সবার কানে বাজায় সুখের বাঁশি।