আশুগঞ্জে মিত্রবাহিনীর স্মরণে নির্মিত মৈত্রীস্তম্ভ উদ্বোধন
আশুগঞ্জ উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী মিত্রবাহিনীর সদস্যদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে ‘মৈত্রীস্তম্ভ। নির্মাণের দুই বছর পর বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে প্রধান অতিথি হিসেবে জেলা প্রশাসক মোঃ আবুসাঈদ এই দৃষ্টিনন্দন মৈত্রীস্তম্ভের উদ্বোধন করেন। এখন থেকে এটি সর্বসাধারণের জন্য উম্মুক্ত থাকবে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউড়া এলাকায় ৩ দশমিক ৬১ একর জমিতে নির্মিত হয় এই ‘মৈত্রীস্তম্ভ ।
মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে তুমুল যুদ্ধের পর ৬ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া শত্রুমুক্ত হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হন। পরে কোন ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া হানাদার মুক্ত হয়। পরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতের ৪র্থ মাউন্টেন ডিভিশনের মিত্র বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিবাহিনীর এস ফোর্সের প্রধান লে. কর্ণেল কে.এম. সফিউল্লাহর নেতৃত্বে যৌথভাবে আশুগঞ্জের দিকে এগিয়ে যায়। তবে ভুল তথ্যের কারণে ৯ ডিসেম্বর রাতে আশুগঞ্জ সোহাগপুর ও কামাউড়া এলাকায় মুক্তি বাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সদস্যদের উপর পাক বাহিনীর সদস্যরা তীব্র হামলা চালায়। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর কর্মকর্তা সহ অন্তত ১৬শত সদস্য প্রাণ হারান। হতাহত হন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা। এই যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীরও ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়।
ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে ২০১৭ সালে ‘মৈত্রীস্তম্ভ¢’ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ সরকার। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ কোটি টাকা। কয়েক দফা মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। নির্মান হওয়ার দীর্ঘ দুই বছরেও এটি উম্মুক্ত করাসহ উদ্বোধন করা হয়নি।
অন্যদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশের ধুলাবালু এবং আশপাশের চাতালকলের কালো ধোঁয়া ও তুষ এই স্মৃতিস্তম্ভের পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় বড় বাঁধা হয়ে দাড়ায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তবর্তী সরকারের সময় ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে ‘মৈত্রীস্তম্ভ উদ্বোধনের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ স্মরণীয় করে রাখতে ২০১৭ সালে আশুগঞ্জে ‘মৈত্রীস্তম্ভ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। শুরুতে এই প্রকল্পের নির্মান ব্যয় ধরা হয় ১৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার সময়ও নির্ধারণ করা হয়। পরে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়ে ৭২ কোটি টাকায় ২০২৪ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। পরে জেলা গণপূর্ত বিভাগ এটি আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করে। এর পর থেকে এটি আশুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এর রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। আউটসোর্সিংয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মী এটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। তখন ক্ষমতায় অন্তবর্তী সরকার।
১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড গঠিত হয়। তারপর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় পর্যন্ত পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর সাথে ভারতীয় সৈন্যরাও যোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধে সীমান্ত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৬৬১ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত হন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রবেশের দুটি ফটক, ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে পশ্চিমাংশে দেয়ালে মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের খোদাই করা চিত্র। সেখানে লেখা-‘আমার কাঁধেই নিলাম তুলে তোমার যত বোঝা, তুমি আমার বাতাস থেকে মুছো তোমার ধুলো, তুমি বাংলা ছাড়ো।’ পাশেই খোদাই করা লেখা রয়েছে-‘দৈনিক পাকিস্তান বাংলা এবারের মুক্তির সংগ্রাম জয় বাংলা’ ও ‘এ মৈত্রী চিরদিন অটুট থাকবে’।
মূল স্মৃতিস্তম্ভের নিচের চারপাশে ব্রোঞ্জে (পিতল) লেখা মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী ভারতীয় সেনা সদস্যদের নাম। তার মধ্যে রয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৭৯ জন অফিসার, ৭০জন জেসিও, ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্য র্যাঙ্কের ১৪৮২ জন সদস্য, ইস্টার্ণ থিয়েটার থার্টি বিএসএফ এর ২৯ জন সদস্য, ইস্টার্ন থার্টি এয়ার ফোর্সের ১১ জন কর্মকর্তা, ইস্টার্ন থার্টি নেভির ৬ জন সদস্যের নাম।
দেয়ালে দেয়ালে একাত্তরের সেই রক্তঝরা দিনগুলোর স্মৃতি, যুদ্ধের বিভীষিকা, স্বজন হারানোর বেদনা, দেশ ছাড়ার অসহায়ত্ব আর বিজয়ের মুহূর্তের ইতিহাস অত্যন্ত সুন্দরভাবে খোদাই করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে ফিতা কেটে মৈত্রীস্তম্ভের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোঃ আবুসাঈদ। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত দোয়ার আয়োজন করা হয়।
এ সময় জেলা প্রশাসক মোঃ আবুসাঈদ বলেন, এটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। জাঁকজমকপূর্ণভাবে করার কথা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা একত্রিত হতে পারছেন না। এটি দেখার জন্য মানুষের মাঝে উৎসাহ রয়েছে। জনপ্রতি প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ ও ৩০ টাকা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রঞ্জন চন্দ্র দে ও আশুগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ রবিউস সারোয়ার।