গণতন্ত্রের সৌন্দর্য: প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন পরিবেশই দেখা গেছে। ফ্যাসিবাদের পতনের পর ২০২৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন দশক পর আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে শুধু কে রাষ্ট্রপতি হবেন—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের একক-প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি অধিক প্রতিযোগিতামূলক ও বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হিসেবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। সংসদে আসন সংখ্যার বিচারে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির প্রার্থী এগিয়ে—কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে এবং বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলাফল আগেই অনুমেয় হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিজেই গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—কারণ গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন নয়; এর সঙ্গে বিরোধী মতের অস্তিত্ব, বিকল্প প্রার্থীর অধিকার এবং ভোটের মাধ্যমে মতপার্থক্য প্রকাশের সুযোগও অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য কেবল কে জিতবেন, তার মধ্যে নয়; বরং কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাচ্ছেন এবং সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা অবাধ ও মর্যাদাপূর্ণ হচ্ছে—তার মধ্যেও নিহিত। বিএনপি প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হলে বিরোধী প্রার্থী ও ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে বিজয়ীকে অভিনন্দন জানানো এবং রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া—এটাই হওয়া উচিত একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বাভাবিক চিত্র। গণতন্ত্রে নির্বাচনে জয়-পরাজয় চূড়ান্ত বিষয় নয়; বরং নির্বাচনের ফলাফলকে সম্মান করা, প্রতিপক্ষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করাই গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুদীর্ঘ সময় এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা অনুপস্থিত ছিল। প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা, ক্ষমতাকে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, ভিন্নমতকে দমন করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা গণতন্ত্রের ভিতকে ক্রমশ দুর্বল করেছে। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি শুধু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; এর প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বিস্তৃত হয়ে আমাদের রাজনৈতিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক আস্থা ও সহনশীলতাকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

১৯৯১ সালে আবদুর রহমান বিশ্বাসের নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চরিত্র ধীরে ধীরে বদলে যায়। ১৯৯৬ সালে বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ, ২০০১ সালে এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ২০০২ সালে ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদ, ২০০৯ সালে জিল্লুর রহমান, ২০১৩ ও ২০১৮ সালে আবদুল হামিদ এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে মো. সাহাবুদ্দিন—প্রত্যেকেই সংসদে কার্যতঃ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছিল।

আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়—বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। নির্বাচনে বিজয়ী পক্ষ যেমন পরাজিতের মতামত ও মর্যাদাকে সম্মান করবে, তেমনি পরাজিত পক্ষও জনগণের রায়কে মেনে নিয়ে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কও হবে; কিন্তু সেই বিরোধিতা যেন রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার পথে না যায়। গণতন্ত্রের প্রকৃত বিজয় তখনই, যখন বিজয়ী অহংকারী হয় না এবং পরাজিত প্রতিহিংসাপরায়ণ হয় না। বিজয়ী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাবে, আর বিরোধী পক্ষ জনগণের স্বার্থে সরকারকে গঠনমূলকভাবে সমালোচনা ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে—এই ভারসাম্যই একটি পরিণত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে, তার অন্যতম দাবি ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। অতীতের ফ্যাসিবাদী প্রবণতা যদি সত্যিই পরিত্যাগ করতে হয়, তাহলে তার প্রকাশ ঘটতে হবে রাজনৈতিক আচরণেও। সুদীর্ঘ সময়ের অনুপস্থিতির পর যদি এই সংস্কৃতি ফিরে আসে, তাহলে সেটিই হবে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার অন্যতম ইতিবাচক লক্ষণ। কারণ ফ্যাসিবাদ শুধু একটি সরকারের নাম নয়—এটি একটি রাজনৈতিক মানসিকতা। সেই মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে সহনশীলতা, বহুত্ববাদ, জবাবদিহি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার রাজনীতিতে ফিরে আসাই হবে আমাদের প্রকৃত গণতান্ত্রিক উত্তরণ।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটিকেও একতরফা আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে নিয়ে আসা। বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে দীর্ঘদিনে পরীক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে প্রার্থী করেছে। এই জায়গাতেই কর্নেল অলি আহমদের প্রার্থিতা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন; তিনি মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির যোদ্ধা, বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকা অলি আহমদ পরবর্তীতে দলত্যাগ করে এলডিপি গঠন করেন। ফলে আজ তিনি বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ধরনের বৃত্ত সম্পন্ন হওয়ার ঘটনাও বটে।

পরাজয় জেনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা—তবু কেন?
প্রথমত, এটি সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের সাংবিধানিক অধিকার ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার প্রকাশ। ১১ দলীয় জোটের নেতারা স্পষ্টভাবে বলেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।

দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে বিরোধী দলগুলো দেখাতে চাইছে—সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা গণতন্ত্রের পূর্ণতা নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি সংখ্যা লঘুর কণ্ঠস্বর, মতপার্থক্য ও বিকল্প প্রস্তাবের সাংবিধানিক উপস্থিতিও গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ।

তৃতীয়ত, এই নির্বাচন বিএনপির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ক্ষমতাসীন দলের জন্য প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরীক্ষা হয় তখনই, যখন তারা নিজেদের জয় নিশ্চিত জেনেও প্রতিপক্ষকে সম্মানজনকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেয়।

প্রায় তিন দশক পর ভোটের লড়াই মূলতঃ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি, বিরোধী মতের স্বীকৃতি এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবনের একটি সম্ভাব্য সূচনা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম বড় প্রত্যাশা ছিল—শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। অতীতের মতো বিজয়ী দল সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে এবং বিরোধী দল কেবল সংখ্যার বিচারে প্রান্তিক হয়ে থাকবে—এমন সংস্কৃতির পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মতের বহুত্ব এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা জরুরি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি ও ১১ দলীয় জোটের পৃথক প্রার্থী দেওয়া একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে। বিশেষ করে ১১ দলীয় জোট রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নকে তাদের প্রার্থিতা ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত করেছে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে—একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন নিজেই গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা নয়। প্রকৃত পরীক্ষা হবে ভোটের পরিবেশ, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ, প্রার্থীদের প্রতি সমান আচরণ এবং পরাজিত পক্ষের প্রতি বিজয়ী পক্ষের রাজনৈতিক আচরণে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সহনশীলতার রাজনীতিতে উত্তরণের পথ সুগম হয়েছে। গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষ মানেই শত্রু নয়। বরং শক্তিশালী গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করা যায়, কিন্তু তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না।

গণতন্ত্রে সব নির্বাচন জেতার জন্য হয় না; কিছু নির্বাচন হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, মতের বহুত্ব প্রকাশের জন্য এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মধ্যে রাখার জন্য। দীর্ঘদিনের একমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে যদি বাংলাদেশ সত্যিই একটি অংশগ্রহণমূলক, বহুত্ববাদী ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে চায়, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেই পথের একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ সুবাতাস হতে পারে। তবে সেই সুবাতাসকে গণতন্ত্রের স্থায়ী আসনে পরিণত করার দায়িত্ব শুধু বিএনপি বা ১১ দলীয় জোটের নয়—রাষ্ট্রের প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তির।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজকর্মী

আরো