পলাশীর বিপর্যয়ঃ শোষণ ও নিপীড়নে ইন্দো-বৃটিশ ষড়যন্ত্রের ভয়াবহতা

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

দার্শনিক জর্জ সান্টায়ানার বিখ্যাত উক্তি “যারা অতীত থেকে শিক্ষা নেয়না, তারা সেই অতীত পূণর্যাপন করার দুর্ভাগ্য বহন করে”। শতাব্দী থেকে শতাব্দী বাংলাদেশের ইতিহাস জুড়ে একথার অনুরণন দেখা গেছে বারংবার। পলাশীর ইতিহাস মূলতঃ মুসলিম শাসন বিদ্বেষী কিছু বিশ্বাসঘাতক চক্রান্তকারীর যোগসাজশে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা বর্গী বেনিয়াদের হাতে তুলে দেয়ার ইতিহাস। ট্রাজিক পলাশীর ইতিহাস, বাংলার স্বাধীনতা হরণের ইতিহাস; জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদসহ এদেশীয় কোলাবোরেটরদের ষড়যন্ত্র, ইংরেজ তোষন ও নিজেদের স্বার্থের কাছে দেশের স্বাধীনতা বিসর্জনের ইতিহাস ও প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। পলাশী শুধুমাত্র ভাগিরথী নদীর তীরে একখন্ড জমিন বা যুদ্ধের ময়দান নয়, এটা স্বাধীনতাপ্রেমী প্রতিটি মানুষের রক্তক্ষরণের স্থান, শত্রæ-মিত্র চিনবার স্থান, শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি প্রেরণারও স্থান। নবাব সিরাজউদ্দৌলা প্রাণ দিয়ে ইতিহাসের স্বর্ণালী অধ্যায় রচনা করে শিখিয়ে গেছেন আগ্রাসী শক্তির সাথে আপোষকামিতার কোন সূযোগ নেই। পক্ষান্তরে, চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রকারী শেঠ, জাঠ, রাজা ও মহারাজা এবং তাদের শিখন্ডিরা বিশ্বাসঘাতকতার ফল ভোগ করে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। পলাশী যুদ্ধের ফলশ্রæতিতে শুধু বাংলা নয়, গোটা ভারতবর্ষ দু’শো বছরের জন্য পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সমৃদ্ধশালী মুসলমানরা পরিণত হয় কড়ির কাঙালে, রাজনৈতিক দিক দিয়ে হয়ে পড়ে নিঃস্ব, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পরিণত হয় সর্বহারা। যেই ব্যাঘ্র শাবকদের রণহুঙ্কারে সারাবিশ্ব তটস্থ থাকত সেই জাতিকে ভেড়ায় পরিণত করার লক্ষ্যে চলল একের পর এক ষড়যন্ত্র- সুকৌশলে মুসলিম যুগের সত্যিকার স্বর্ণালী ইতিহাস থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিতে চালানো হয় ইতিহাসের নিকৃষ্টতম দমন-পীড়ন। মুসলমানদের প্রাণশক্তি জেহাদী চেতনা কেড়ে নিয়ে হাতে তুলে দেয়া হয় তসবির দানা, রণাঙ্গন বিস্মৃত হয়ে মিলাদ মাহফিলে নাজাত অনুসন্ধানে অনেকে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মুক্তিকামী মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বৃটিশ বিরোধী লড়াইয়ের সূযোগে ফায়দা লুটে নেয় বেনিফিশিয়ার বর্ণহিন্দু শ্রেণী। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ও সম্পদ লুন্ঠণে চক্রান্ত কারীরা আগের চেয়ে অধিক তৎপর, বদলেছে শুধু ষড়যন্ত্রের কৌশল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নবতর সংস্করণ আধিপত্যবাদী-সম্রাজ্যবাদী প্রভুদের উচ্ছিস্টভোগী এনজিও, বহুজাতিক কোম্পানী, সুদী মহাজন বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন দাতা সংস্থাসমূহের খবরদারী আমাদের পায়ে গোলামীর জিঞ্জির পড়ানোরই নামান্তর। ভ্রাতৃঘাতি-আত্মঘাতী বিপর্যয় ও ষড়যন্ত্রমূলক দুঃসহ অবস্থা থেকে পরিত্রান পেতে পলাশীর সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র থেকে শিক্ষা নেয়া জরুরী।
বিখ্যাত পর্তুগীজ ঐতিহাসিক বাকসার পলাশীর যুদ্ধকে গুরুত্বের দিক থেকে পৃথিবীর সেরা যুদ্ধগুলোর অন্যতম মনে করেন। সামান্য ব্যক্তিস্বার্থেও বশবর্তী হয়ে স্বাধীনতা বিসর্জনের এমন নজির পলাশী ছাড়া পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায়না। মুর্শিদাবাদের পলাশী মৌজায় সংঘটিত যুদ্ধের নামে এমনতর প্রহসন সম্পর্কে ঐতিহাসিক তপন মোহন চট্রোপাধ্যায় ‘পলাশীর যুদ্ধ’ গ্রন্থের ১৭৩ পৃষ্ঠায় লিখেনঃ “পলাশীর যুদ্ধ একটা যুদ্ধের মতন যুদ্ধ বলে কেউ স্বীকার করেনা। কিন্তু সেই যুদ্ধের ফলেই আস্তে আস্তে এক মুঠো কারবারী লোক গজকাঠির বদলে রাজদন্ড হাতে ধরলেন। প্রথম থেকেই তাঁরা রাজত্ব করলেননা বটে কিন্তু বাংলাদেশের ভাগ্য নিয়ন্তা হয়ে দাঁড়ালেন”। নদীয়া, বর্ধমান, বিষ্ণুপুর, মোদিনীপুর, দিনাজপুর ও বীরভূমের রাজা মহারাজারা মুর্শিদাবাদে সমবেত হয়ে দেওয়ান-ই-সুবা মহারাজা মহেন্দ্রের কাছে বেশকিছু দাবী পেশ করেন, তাদের ক্রমবর্ধিষ্ণু দাবী মেটাতে অপারগ হলে জগৎশেঠের পরামর্শে তারা মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নেতৃত্বে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কৃষ্ণ চন্দ্র মিঃ ড্রেকের সাথে সাক্ষাৎ করে নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আহবান জানিয়ে সর্বমুখী সাহায্য প্রদানের আশ্বাস প্রদান করে। (খবৎৎরঃরধষ অৎরংঃড়পৎধপু ড়ভ ইধহমষধ ঃযব ঘধফরধ জধল: ঈ.জ. ১৮৭২ ও.ঠ-১০৭-১১০)
ইংরেজদের এদেশীয় এজেন্টরা একদিকে খুঁটি হিসাবে ইংরেজদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে অন্যদিকে মীর জাফর আলীকে নবাবীর প্রলোভন দেখিয়ে বিশ্বাসঘাতকতার দিকে ধাবিত করে। দীর্ঘদিনের পরিকল্পণা ও ষড়যন্ত্রে শাহী মহলের ক্ষমতালোভী ও স্বার্থান্বেষী ওমরা, হিন্দু রাজা-মহারাজা, শেঠদের সাথে বর্গী-বেণিয়া আগ্রাসী বৃটিশদের যোগসাজশে ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন সুবে বাংলার স্বাধীনতা হরণের নাতিদীর্ঘ একটি দৃশ্যপট মঞ্চস্থ হয়। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু তার ‘ডিসকভারী অব ইন্ডিয়া’তে লিখেছেন “ক্লাইভের বিজয় ছিল প্রতারণা ও ছলচাতুরীর বিজয়”।

ইংরেজ বেনিয়া ও দালালদের লুন্ঠনঃ ইতিহাসের জঘন্যতম দুর্ভিক্ষের কলঙ্কজনক অধ্যায়
নবাব সিরাজউদ্দৌলার ভাগ্য বিপর্যয় এবং ১৭৬৪ খ্রী: বখশারে মীর কাসিমের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার সাড়ে পাঁচশ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। মুসলমানরা যাতে শির তুলে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বিপন্ন, অবাধ লুটপাট চালিয়ে অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সৃষ্টি করা হয় অচলায়তন। দিল্লীর সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে ১৭৬৫ সালের ১২ই আগস্ট রাজস্ব আদায়ের আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব আদায় করলেও ১৭৫৭ সাল থেকেই শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল। মীর জাফরকে পুতুল নবাব বানালেও লর্ড ক্লাইভই ছিল পর্দার আড়ালে প্রকৃত নবাব। পুতুল নবাবীর সূচনা হতেই ইংরেজরা ইতিহাসের নজীরবিহীন শোষণ ও লুন্ঠণ চালিয়েছিল। ইংরেজদের নানা অন্যায় আবদার মেটাতে গিয়ে মীরজাফর রাজকোষ শূন্য করে ফেলে। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং সৈন্য ও নৌবহরের ব্যয় বাবদ কোম্পানী ২৫,৩১,০০০ পাউন্ড জোরপূর্বক আদায় করেছিল। পলাশী বিজয়ের বখশিশ হিসেবে ২লাখ ৩৪ হাজার পাউন্ড আদায় করে লর্ড ক্লাইভ রাতারাতি ইংল্যান্ডের সেরা ধনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ছয় কর্মচারী প্রত্যেককে ১৫০,০০০ পাউন্ড, কোম্পানীর কলকাতা কাউন্সিলর প্রত্যেককে ৫০,০০০ হতে ৮০,০০০ পাউন্ড ঘুষ প্রদানে বাধ্য করা হয় (পি রবার্টস: হিস্টরী অব বৃটিশ ইন্ডিয়া)। এছাড়াও মীর জাফর ইংরেজ প্রধানদের খুশী করতে ৬,৬০,৩৭৫ পাউন্ড উপঢৌকন দিয়েছিল। মীর জাফরের কাছ থেকে ইংরেজ কর্মচারীরা ২৪ পরগণা জেলার জমি ছাড়াও ত্রিশ লাখ পাউন্ড ইনাম নিয়েছিল। ১৭৬৫ সালে পিতার মৃত্যুর পর মীরজাফর তনয় নাজমুদ্দৌলাহ মসনদ লাভের জন্য কোম্পানীর কর্মচারীদেরকে যে ঘুষ দেন তার পরিমাণ ছিল ৮,৭৫,০০০ টাকা। রেজা খান ২৭৫,০০০ টাকার উৎকোচের বিনিময়ে এই অপ্রাপ্ত বয়স্ক নবাবের নাযেম নিযুক্ত হয়েছিলেন।
পলাশী পরবর্তী সুবে বাংলাÑদুর্নীতির গোড়াপত্তন
আমাদের সংস্কৃতিতে প্রচলিত ইনাম, উৎকোচ, উপঢৌকন কিংবা ঘুষ নামক দুর্নীতির যে ব্যাপকতা দেখা যায় তা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তাদের অশুভ উদ্দেশ্যে প্রচলন করেছিল। বৃটিশ সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে জানা যায় শুধুমাত্র ১৭৫৭-১৭৬৬ খ্রী: পর্যন্ত মাত্র দশ বছরে ইংরেজ ও তাদের এদেশীয় দালালরা ৬০ লাখ পাউন্ড দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছিল। বৃটিশ পার্লামেন্টে ক্লাইভের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হলে আত্মপক্ষ সমর্থন করে ক্লাইভ বলেছিলঃ
“পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর আমার যে অবস্থা হয়েছিল, তা আপনারা বিবেচনা করুন। একজন বড় রাজার ভাগ্য আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে। একটি সমৃদ্ধ নগর আমার দয়ার প্রতীক্ষায় আছে। আমার মুখের সামান্য হাসিতে কৃতার্থ হবার জন্য ধনী মহাজনরা একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। আমার দুই পাশে স্বর্ণ আর মণিমুক্তায় পূর্ণ সিন্দুকের সারি এবং এগুলি কেবল আমারই জন্য খোলা হয়েছে। সভাপতি মহোদয়, এ মূহুর্তে আমি নিজেই ভেবে অবাক হই যে, তখন আমি কিভাবে নিজেকে সংযত করতে পেরেছিলাম।” [Fourth Parliamentry Report 1773, Page-535] ১৭৭৩, চধমব-৫৩৫]
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাইটার-ফ্যাক্টর-সেমি মার্চেন্ট নিম্নশ্রেণীর ইংরেজ কর্মচারী ও লুন্ঠণ সহযোগী তাদের এদেশীয় দালাল শ্রেণীর হাতে গড়ে উঠা ‘বাবু কালচার’ নামের নতুন সংস্কৃতি এদেশের মুসলমানদের অন্তরে নতুন শংকার জন্ম দেয়। বাবু সম্পর্কে জে.এইচ. ব্রমফিল্ড যথার্থই বলেছেন- ““Babu: In Bengali a title of respect for an English speaking Hindu. Applied Deroggatorily by the British to semi educated Bhadralok and by extension to any Bhadralok.”
মোর্দ্দাকথা, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইনাম, উৎকোচ, উপঢৌকন কিংবা ঘুষ নামক দুর্নীতির যে ব্যাপকতা তা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তাদের নীল নকশা বাস্তবায়নের অশুভ উদ্দেশ্যে প্রচলন করেছিল। বৃটিশ সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে জানা যায়- শুধুমাত্র ১৭৫৭-১৭৬৬ খৃঃ পর্যন্ত মাত্র দশ বছরে ইংরেজ ও তাদের এদেশীয় দালালরা ষাট লাখ পাউন্ড অবৈধভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছিল। বৃটিশ পার্লামেন্টে ক্লাইভের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং আত্মপক্ষ সমর্থন করে রবার্ট ক্লাইভ বলেছিলঃ
“পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর আমার যে অবস্থা হয়েছিল, তা আপনারা বিবেচনা করুন। একজন বড় রাজার ভাগ্য আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে। একটি সমৃদ্ধ নগর আমার দয়ার প্রতীক্ষায় আছে। আমার মুখের সামান্য হাসিতে কৃতার্থ হবার জন্য ধনী মহাজনরা একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। আমার দুই পাশে স্বর্ণ আর মণিমুক্তায় পূর্ণ সিন্দুকের সারি এবং এগুলি কেবল আমারই জন্য খোলা হয়েছে। সভাপতি মহোদয়, এ মূহুর্তে আমি নিজেই ভেবে অবাক হই যে, তখন আমি কিভাবে নিজেকে সংযত করতে পেরেছিলাম।” [ঋড়ঁৎঃয চধৎষরধসবহঃৎু জবঢ়ড়ৎঃ ১৭৭৩, চধমব-৫৩৫]
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর এমিরেটস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বাবুবিলাস সম্পর্কে লিখেনÑ ‘কলকাতার এই বাবুদের সামাজিক মান মর্যাদার মাপকাঠি ছিল টাকা। সেই টাকার প্রাপ্তি ঘটেছে ইংরেজদের লুন্ঠন সহযোগীরূপে। এইভাবেই তারা সারা বাংলার রক্ত শোষন করে কলকাতায় গড়ে তুলেছিল প্রাচুর্যের পাহাড়। এই কালো টাকার মালিকদের পরিচয় ছিল ইংরেজদের দেওয়ান, বেনিয়ান, মুৎসুদ্দী, সরকার, কেরাণী প্রর্ভৃতি নামে। আরো ছিল কোম্পানীর উকিল ও জমিদারীর শেরেস্তাদার। ইংরেজরা তাদের পিঠ চাপড়ে বলতো বø্যাক জামিনদার। দুর্নীতির নানা কানা-গলিপথে বø্যাক মানি অর্থাৎ লক্ষী এসে বাসা বেঁধেছিল এদের ঘরে। এরূপ অনেক বø্যাক জামিনদার বা ক্যালকাটা বাবু দুই/ চার/ পাঁচ টাকা বেতনের কর্মচারী থেকে সে যুগের ধনকুবেরে পরিণত হয়েছিল। রাম দুলাল দে পাঁচ টাকা বেতনের সরকার হিসেবে জীবন শুরু করেন। ১৮২৫ সালে মৃত্যুর সময় কলকাতা শহরে তিনি রেখে গেছেন উনিশটি বিশাল বাড়ি আর সে আমলের পৌনে সাত লক্ষাধিক টাকার সম্পদ। কলকাতার বিখ্যাত ছাতুবাবু-লাটুবাবুরা ছিল তারই সন্তান। কলকাতার অন্যতম বিখ্যাত পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মতিলাল শীল পুরাতন শিশি বোতলের কারবার দিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন। আট টাকা বেতনের চাকুরী শুরু করে রামকমল সেন মৃত্যুর সময় নগদ রেখে যান দশ লক্ষ টাকা। হেস্টিংস এর মুৎসুদ্দীগিরি করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কাশিমবাজারের রাজ পরিবার, যার বার্ষিক আয় ছিল তিন লাখ টাকা। (সূর্যাস্ত আইনের সামাজিক তাৎপর্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, আষাঢ়, ১৩৮৫)
উপর্যুপরি দুর্ভিক্ষের ফলে সারা বাংলার মানুষ যখন ক্ষুধার জ্বালায় ক্ষত-বিক্ষত তষনও চলছিল ইংরেজ ও তাদের দোসর ক্যালকাটা বাবুদের লুন্ঠণ-শোষণ। নানা প্রকারের বাবু বিলাস তখনকার কলকাতায় চালু ছিল। তাদের বিকৃত রুচির তৃপ্তি সাধনে চলছিল বাইজী চর্চা থেকে শুরু করে বুলবুলির লড়াই, টিকটিকির নাচ ইত্যাদি, চলছিল পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আভিজাত্যের প্রতিযোগিতা। গঙ্গা গোবিন্দ সিংহের মায়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে সে যুগের কুড়ি লাখ টাকা খরচ, তার নাতি লালা বাবুর অন্ন প্রাসন উপলক্ষে সোনার পাতে দাওয়াত ছেপে আমন্ত্রণ জানানো, আশুতোষ দেব ও দ্বারকানাথ ঠাকুরের মায়ের শ্রাদ্ধ বাবু বিলাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
সুবে বাংলায় নেমে আসল মহামন্বান্তর
ইংরেজ বণিকশ্রেণী, তাদের লুন্ঠন সহচর বর্ণহিন্দু রাজা-মহারাজা, জগৎশেঠ-আলম চাঁদ প্রমুখ কোটিপতি লগ্নি পুজির মালিক-আত্মীয়-স্বজন-এজেন্ট-বেনিয়া-নতুন বর্ণ হিন্দু শহুরে জমিদার শ্রেণী-দালাল-নায়েব-গোমস্তা প্রভৃতি অর্থলগ্নিী চক্র তাদের গোলা, মড়াই, আড়ৎ ও কাচারীতে সারা বাংলায় উৎপাদিত খাদ্য শস্য মজুদ করতো। মোঘল শাসনামলে কৃষকদের কাছ থেকে মোট কৃষি ফলনের ১০-১৫ শতাংশ রাজস্ব গ্রহণ করে বিরূপ আবহাওয়াজনিত কারণে পরবর্তী ফলনে যেকোন সমস্যা মোকাবেলায় নিরাপত্তা তহবিল হিসাবে ব্যবহার করা হতো। ১৭৬৫ সালে এলাহাবাদ চুক্তি অনুযায়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী মোঘল স¤্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব গ্রহণ করলো, ১৫% করকে ৫০% শতাংশ রাজস্বে রূপান্তর, ভ‚মি কর ৬০% হারে বৃদ্ধি করলো এবং বাংলার কৃষকরা জানতোনা যে এই অর্থ হাতবদল হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছে চলে যাচ্ছে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত রীতির পরিবর্তে দেখা গেল একজন ইংরেজ কালেক্টর ও একজন হিন্দু কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং আদায়কৃত অর্থ জনকল্যাণে ব্যবহার না করে ইংল্যান্ডের ব্যাংক ও ইংরেজ চালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়েছে। যেসব কৃষক ধান ও সবজি চাষে সচরাচর অভ্যস্ত ছিল তাদেরকে নীল ও আফিম চাষে বাধ্য করা হলো। মোঘল শাসকদের মত কর মওকুফ বা আক্রান্তদের প্রতি কোনরূপ সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নেয়া হলোনা। বৃটিশদের একদেশদর্শী ও অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের মনোভাবে গ্রামাঞ্চলগুলো ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছিল। ১৯৪৩ সালের দৃর্ভিক্ষেও ৩ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায়।
একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়Ñইংরেজ বেনিয়া এবং দালাল বাবু শ্রেণীর ঘৃণ্য লুটপাট ও দুর্নীতির ফলে সমগ্র বাংলা ও বিহারে মহামন্বন্তর নেমে এসেছিলো। বৃটিশরাজের অধীনে ভারতবাসী অসংখ্য দুর্ভিক্ষ ঈস্খ্যুক্ষ করেছে, সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত এসেছিল বাংলায়। ১৭৭০, ১৭৮৩, ১৮৬৬, ১৮৭৩, ১৮৯২, ১৮৯৭ সালে ও সর্বশেষ ১৯৪৩-৪৪ সালে মারাত্মক দুর্ভিক্ষে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে ১৭৭৩ সাল পর্যন্ত ১০ মিলিয়ন বনি আদম জীবন হারিয়েছিল, বাংলার এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। মার্কিন দার্শনিক ঔড়যহ ঋরংশ লিখিত ‘ঞযব টহংববহ ডড়ৎষফ’ এ লিখেছেনÑ “১৭৭০ খ্রী: বাংলার দুর্ভিক্ষ ছিল চতুর্দশ শতকের গোটা ইউরোপ কাাঁপানো ইষধপশ চষধমঁব এর চাইতে অধিক ভয়াবহ।” ১৭৭২ সালের ৩রা নভেম্বর বাংলার গভর্ণর ওয়ারেন হেস্টিংস ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিলেতি ডিরেক্টর বোর্ডকে জানান যেÑ‘দুর্ভিক্ষে এই প্রদেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি লোক মারা গেছে, চাষাবাদেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে’। এছাড়া ১৭৯৩ খ্রী: লর্ড কর্ণওয়ালিস কর্তৃক চিরস্থায়ী ভিত্তিতে জমিদারী প্রথা চালুর ফলে নব্য জমিদার শ্রেণীর আত্মপ্রকাশ ঘটে যারা ছিল বিদেশী প্রভুদের একান্ত অনুগত ও বিশ্বাসভাজন। অবাধ লুণ্ঠনের অধিকার পাওয়া এসব জমিদার ধন অর্জনের উদ্দেশ্যে লাঠিয়াল বাহিনী ও দস্যু-তস্করদের লালন পালন করত (১৯৪৪ সাল, Black Plague জবারব)। বুকানন বলেনÑ“রায়তদেরকে বাড়ী থেকে ধরে এনে কয়েকদিন পর্যন্ত আবদ্ধ রেখে নিরক্ষর প্রজাদের নিকট থেকে জাল রশিদ দিয়ে জমিদারের কর্মচারীগণ খাজনা আদায় করে আত্মসাৎ করতো।” (Martin-The History-Antiquities Topocraogt and stakes of the esters Indian London-1438, Vol-11) -১৪৩৮, ঠড়ষ-১১)
অসহায় দরিদ্র চাষাদের রক্তঝড়া ঘামে দাদাদের বাবু বিলাস
নির্যাতিত, অবহেলিত ও বঞ্চিত নি¤œ শ্রেণীর মানুষের শ্রমে উৎপাদিত ফসল হিন্দু জমিদারের ঘরে তুলে দিতে হতো অথচ তাদেরকে খেয়ে না খেয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হতো। অত্যাচারী ইংরেজ ও তাদের সহযোগী হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম গর্জে উঠলেনÑ
ওঠরে চাষী জসৎবাসী ধর কষে লাঙল
আমরা মরতে আছি ভালো করে মরব এবার চল।
মোদেও উঠান ভরা শস্য ছিল হাস্য ভরা দেশ
ঐ বৈশ্য দেশের দস্যু এসে লাঞ্ছনার নাই শেষ
ও ভাই লক্ষ হতে টানছে তারা লক্ষী মায়ের কেশ
আজ মা’র কাঁদনে লোনা হল সাত সাগরের জল।
ও ভাই আমরা ছিলাম পরম সুখী, ছিলাম দেশের প্রাণ
তখন গলায় গলায় গান ছিল ভাই, গোলায় গোলায় ধান
আজ কোথায় বা সে-গান গেল ভাই, কোথায় সে কৃষাণ?
ও ভাই মোদেও রক্ত জল হয়ে আজ ভরতেছে বোতল
আজ চারদিক হতে ধনিত বণিক শোষণকারী জাত
ও ভাই জোঁকের মতন শুষছে রক্ত, কাড়ছে থালার ভাত
মোর বুকের কাছে মরছে খোকা, নাইকো আমার হাত
আজ সতী মেয়ের বসন কেড়ে খেলছে খেলা খল্।
ও ভাই আমার মাটির খাঁটি ছেলে দূর্বাদল-শ্যাম
আর মোদের রূপেই ছড়িয়ে আছেন রাবণ-অরি রাম।
ঐ হালের ফলায় শষ্য উঠে, সীতা তারি নাম
আজ হরছে রাবণ সেই সীতারেÑেসেই মাঠের ফসল
ও ভাই আমরা শহীদ, মাঠের মক্কায় কোরবানী দিই জান্
আর সেই খুনে যে ফলছে ফসল, হরছে তা শয়তান
আমরা যাই কোথায় ভাই ঘরে আগুন বাইরে যে তুফান
আজ চারদিক হতে ঘিরে মারে এজিদ রাজার দল।
আজ জাগরে কিষাণ সব তো গেছে কিসেবা আর ভয়?
এই ক্ষুধার জোরেই করব এবার সুধার জগৎ জয়।
ঐ বিশ^জয়ী দস্যুরাজার হয়কে করব নয়
ওরে দেখবে এবার সভ্য জগৎ চাষার কত বল।
পলাশীর নাটক ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন মঞ্চস্থ হয়। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজের ছিল ৫৩টি কামান, ১৮হাজার অশ্বারোহী ও ৫০হাজার পদাতিক বাহিনী, অপরপক্ষে ইংরেজদের ছিল ১১০০ গোরা, ২২০০ দেশীয় সৈন্য এবং ৯টি কামান। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু তার ‘ডিসকভারী অব ইন্ডিয়া’তে লিখেছেন “ক্লাইভের বিজয় ছিল প্রতারণা ও ছলচাতুরীর বিজয়”। অথচ এর ক্ষেত্র তৈরী করা হয়েছিল এই মর্মান্তিক ট্রাজেডির প্রায় দু’শ বছর পূর্বে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন ও তাঁর পুত্র আকবরের শাসনামলে। পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন সিরাজউদ্দৌলা আমৃত্যু লড়াই করেছেন, আপোষ করেননি।
সুজলা-সুফলা সোনার বাংলাদেশ অনেক কষ্টে স্বাধীন অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকলেও আর কতদিন এভাবে লড়াই করে টিকে থাকতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। একটি জাতীয় সংগীত, একটি মানচিত্র কিংবা একটি জাতীয় পতাকা স্বাধীন অস্তিত্বের অনুষঙ্গ হতে পারে। তবে আমরা যেভাবে স্বকীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে আধিপত্যবাদীদের লেজুড় হয়ে বেঁচে থাকার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ন হয়েছি তাতে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে অত্যন্ত অসহায় বোধ করছি। পলাশীর বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের জাতিসত্ত¡ার স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম সময়ের দাবী। ইংরেজ বেনিয়া ও এদেশীয় বিশ^াসঘাতকদের যোগসাজশে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব পরাজিত হলেও আপোষকামিতার বিপরীতে আমাদেরকে লড়াই করার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। পলাশীর বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের জাতিসত্ত¡ার স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম আজ সময়ের দাবী। ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই সুমহান দায়িত্ব পালনে আমাদের তরুণ-যুবাদের অগ্রনী ভ‚মিকা রাখার সূযোগ রয়েছে। মুসলিম জাতিসত্ত¡া, জাতীয় চেতনা ও আমাদের প্রেরণার মহান কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়Ñ
কান্ডারী! তব সম্মুখে পলাশীর প্রান্তর
বাংগালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের ভঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙ্গিয়া পূণর্বার!

*লেখক, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী
taazabdullah@gmail.com

আরো